কেরানীগঞ্জে কিশোর গ্যাং লিডারকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা
ঢাকার কেরানীগঞ্জে পূর্বশত্রুতার জেরে মো. ফরহাদ হোসেন (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত ফরহাদ রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকার কিশোর গ্যাং…
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে এবার ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আজমের ছবি লাগিয়ে পদদলিত করেছেন একদল শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের একদল শিক্ষার্থী এ কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদেই তাঁরা এই প্রতীকী কর্মসূচি পালন করেছেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি লাগানোর পর নিজের ইচ্ছার কথা উল্লেখ করে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেই বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাঁরাও সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেদের ইচ্ছায় জিন্নাহ ও গোলাম আজমের ছবি মেঝেতে লাগিয়ে পদদলিত করেছেন।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শিব্বির আহমেদ বলেন, ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদকের ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার কথা ছিল। কিন্তু তিনি একজন পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তির ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় সম্মানের সঙ্গে প্রদর্শন করতে চেয়েছেন।
শিব্বির আহমেদ বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষমতা দিয়ে এবং বাংলাদেশপন্থীদের ক্ষমতা দিয়ে গোলাম আজম এবং জিন্নাহর ছবি, পাকিস্তানপন্থীদের ছবি পায়ের নিচে লাগালাম। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশে কোনো পাকিস্তানপন্থীদের রাজনীতি সামনে আনানো যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখেছি বিগত দিনে শেখ মুজিবের ছবি দিয়ে রাজনীতি পরিচালনা করত। এখানে স্পষ্ট যে, শেখ মুজিবের ছবির রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে তারা জিন্নাহ এবং গোলাম আজমের ছবি আনতে চেয়েছে।”
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ইংলিশ ফর স্পিকারস অব আদার ল্যাংগুয়েজ বিভাগের শিক্ষার্থী আশ শামস বলেন, “কিছু দিন ধরে দেখতেছি যে জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে খুব সম্ভবত ইনকিলাব মঞ্চ থেকে জিন্নাহর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়, সেখানে ঝুমা আপু অতি উৎসাহের সঙ্গে পোস্টার শেয়ার দেন।”
তিনি বলেন, “পরবর্তীতে জিন্নাহর ছবি যখন ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে মুছে দেওয়া হয় বা ফেলে দেওয়া হয়, তখন তিনি আবার ফেসবুকে পোস্ট করেন যে ডাকসু সংগ্রহশালায় নাকি ছবি তুলে নেওয়া হচ্ছে, ভাঙচুর করা হচ্ছে।”
আশ শামস বলেন, “তাদের কতটা আক্ষেপ হতে পারে জিন্নাহর ছবি সরিয়ে নেওয়া নিয়ে! আমাদের দাবি থাকবে, তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তো তারা যেন বাংলাদেশের পক্ষে থাকে, বাংলাদেশপন্থীদের পক্ষে থাকে।”
যেভাবে শুরু বিতর্ক
ডাকসু সংগ্রহশালা সংস্কারের পর গত রোববার এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। সংস্কারের পর সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কোনো একক ছবি রাখা হয়নি বলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অভিযোগ করে।
এর পরিবর্তে পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানের। ওই অনুষ্ঠানে জিন্নাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’।
সংগ্রহশালায় ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবিও রাখা হয়। এর পাশাপাশি ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পেপার কাটিং প্রদর্শন করা হয়। সেখানে তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবিও স্থান পায়।
সংগ্রহশালায় এসব ছবি ও তথ্য প্রদর্শনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রোববার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে জিন্নাহর ছবি রাখার বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রশ্ন তোলে।
জিন্নাহর ছবি ছেঁড়ার পর নতুন কর্মসূচি
বিতর্কের মধ্যেই সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি ওই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানান।
এরপর সংগ্রহশালায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আজমের একটি ছবি টানিয়ে দেওয়া হয়। ছবিটি ছিল ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমের সামনে গোলাম আজমকে জুতাপেটা করার একটি ঘটনার। ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা ওই ছবি সেখানে টানিয়ে দেন বলে জানা গেছে।
এর একদিন পর মঙ্গলবার জিন্নাহ ও গোলাম আজমের ছবি ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে লাগিয়ে পদদলিত করার কর্মসূচি পালন করেন একদল শিক্ষার্থী।
সংগ্রহশালাকে ঘিরে রাজনৈতিক ইতিহাসের বিতর্ক
ডাকসু সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
একদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের বক্তব্য, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও ভাষানীতির সঙ্গে জিন্নাহর ভূমিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই তাঁকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। অন্যদিকে অপর একটি পক্ষের দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহে জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকা এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনামূলক প্রেক্ষাপট ছাড়া তাঁর ছবি সম্মানের সঙ্গে প্রদর্শন করা হলে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটতে পারে।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, ডাকসু একটি ঐতিহাসিক ছাত্রসংগঠন হিসেবে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে ডাকসুর সংগ্রহশালায় কোন ব্যক্তির ছবি কীভাবে এবং কোন ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রদর্শন করা হবে, তা নিয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেটি এখন কেবল একটি ছবি রাখা বা সরানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং ডাকসুর সংগ্রহশালার ঐতিহাসিক ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নও।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একাংশের পাল্টা কর্মসূচিতে জিন্নাহর পাশাপাশি গোলাম আজমের ছবি ব্যবহার করায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তাঁরা এটিকে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন।
মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে তাঁদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তাঁরা ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au