চব্বিশের ৪ আগস্ট: এক থানায় ১৫ পুলিশ সদস্য নিহত, এরপর কী ঘটেছিল?
মেলবোর্ন, ১ আগস্ট:“ছোটভাইকে ফোন করে বলেছিলাম আমাদের থানা অ্যাটাক করেছে। আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। সুযোগ নাই আমাদের বাঁচার। এটাই আমার শেষ কথা জীবনের।…
মেলবোর্ন, ১ আগষ্ট- সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও গোলাপগঞ্জে টানা কয়েক দিনের ব্যবধানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিতে হামলা, বাধা এবং সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিভিন্ন দলের নেতা এবং পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার কি অনিচ্ছাকৃতভাবে, নাকি কৌশলগতভাবে এনসিপিকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসছে? একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে, ধারাবাহিক হামলার শিকার হলে এনসিপি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে কি না।
বর্তমান সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল হলেও সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির দিক থেকে এনসিপি অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়ার মতো সাংগঠনিক সক্ষমতা এখনো দলটির পুরোপুরি তৈরি হয়নি বলেও মত রয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, যদি কোনো রাজনৈতিক দল ধারাবাহিকভাবে হামলা, বাধা ও দমন-পীড়নের শিকার হয়, তাহলে জনমনে তাদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে এনসিপির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দলটিকে জাতীয় রাজনীতিতে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
হবিগঞ্জ থেকে গোলাপগঞ্জ, টানা তিন দিনের উত্তেজনা
ঘটনার সূত্রপাত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। সেদিন হবিগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনে বক্তব্য চলাকালে হামলার শিকার হন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ অন্তত ১০ নেতাকর্মী।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ২৯ জুলাই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে এনসিপি। তবে সেদিন হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। কর্মসূচিতে যোগ দিতে ঢাকা থেকে রওনা হওয়া এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পুলিশ বাধা দেয়। সাতগাঁও এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বালুভর্তি ট্রাক ফেলে তাদের গাড়িবহরের পথরোধ করা হয়। পরে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া এলাকাতেও পুলিশের বাধার মুখে পড়েন তারা।

নাসীরুদ্দীন ও সারজিসের ওপর বিএনপির হামলা। ছবিঃ সংগৃহীত
এরপর ৩০ জুলাই সিলেটের গোলাপগঞ্জে সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এনসিপির অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব হামলা হয়েছে। তবে বিএনপির স্থানীয় নেতারা দাবি করেছেন, এনসিপির নেতারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নিয়ে অশোভন মন্তব্য করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সরকার কি বিরোধী দল তৈরি করছে?
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো, এসব হামলা কি শেষ পর্যন্ত এনসিপিকেই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধা দেবে?
একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দল অপরিহার্য। বর্তমান সংসদে জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হলেও সরকারবিরোধী রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে অনেকে মনে করছেন। সংসদীয় কার্যক্রম, মাঠের আন্দোলন এবং জনমুখী ইস্যুতে এনসিপি বরং বেশি সক্রিয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এনসিপির ওপর হামলার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, তাহলে জনমনে দলটির প্রতি সহানুভূতি বাড়তে পারে এবং সেটি রাজনৈতিকভাবে তাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, কে কার ওপর হামলা করেছে, সেটি তদন্তের বিষয়। তবে যদি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে সরকারের জন্য তা উদ্বেগের কারণ। কারণ এনসিপি জুলাই আন্দোলনের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরও রয়েছে।
তিনি বলেন, ধারাবাহিকভাবে হামলার শিকার হলে এনসিপি প্রধান বিরোধী দলের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে। তবে এখনই রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করার সময় আসেনি। তিনি উভয় পক্ষকেই সংযত থাকার আহ্বান জানান।
‘সরকার নিজের পায়ে কুড়াল মারছে‘
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকার গঠনের পর বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে সাংগঠনিকভাবে যতটা সক্রিয় থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছে প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিচালনায়। বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে তৃণমূলে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের বদলে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের দাপট বেড়েছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি এসব হামলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বিএনপি নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে পুলিশের বাঁধার মুখে পড়েন এনসিপির নেতারা। বুধবার বিকেল চারটার দিকে শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও এলাকায় চা–কন্যা ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা–সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে।ছবি: সংগৃহীত
এনসিপির অভিযোগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় ছাত্রশক্তির এক অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে রাস্তা অবরোধ করা শেখ হাসিনার আমলের কৌশলের পুনরাবৃত্তি। তিনি সরকারকে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এনসিপির মিডিয়া সেলের প্রধান মাহবুবুল আলম অভিযোগ করেন, অতীতে আওয়ামী লীগ যেমন বিরোধী মতের ওপর হামলা চালাত, এখন একই ধরনের আচরণ বিএনপির পক্ষ থেকেও দেখা যাচ্ছে। তার ভাষ্য, সরকার একটি উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে এবং কোনো হামলারই বিচার করা হয়নি।

গোলাপগঞ্জে সফরকালে হামলার অভিযোগের পর পুলিশি নিরাপত্তায় কানাইঘাটে যাচ্ছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। ছবি: সংগৃহীত
হবিগঞ্জে আহত জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আলিফ চৌধুরী বর্তমানে ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। এনসিপির দাবি, হামলায় তিনি একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং অন্য চোখও ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ ঘটনার পর সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন সরকারের কাছে তিন দফা দাবি জানান। এগুলো হলো, আলিফ চৌধুরীর চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা এবং এনসিপিসহ সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিএনপির অবস্থান
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকার দেশে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে চায়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো মত প্রকাশ করবে, তবে সেই মত প্রকাশেরও একটি সভ্য মান থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বলেন, বিএনপি কোনো ধরনের হামলার রাজনীতি সমর্থন করে না। হবিগঞ্জের ঘটনায় কারা জড়িত, তা প্রশাসনের তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।
জামায়াত ও অন্যান্য দলের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকার মুখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারছে না। তিনি এনসিপির কর্মসূচিতে হামলার নিন্দা জানান।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, হবিগঞ্জে হামলার পর প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও ১৪৪ ধারা জারি করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী। তার মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবেই দেওয়া উচিত, হামলার মাধ্যমে নয়।
একই ধরনের মত দিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, কোনো বক্তব্যে আপত্তি থাকলে তার রাজনৈতিক জবাব দেওয়া উচিত, সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেমন কার্যকর বিরোধী দল প্রয়োজন, তেমনি ক্ষমতাসীন দলকেও সরকার পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় থাকতে হয়। অন্যথায় স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত বাড়তে পারে।
তাদের মতে, ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে যদি এনসিপি জনসমর্থন অর্জন করে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে প্রতিশোধের সংস্কৃতি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখা এবং সব ধরনের হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে মনে করছেন তারা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au