মেলবোর্ন, ১ আগস্ট: গাজায় দীর্ঘদিনের সংঘাত অবসানে নতুন করে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চললেও ইসরায়েল ও হামাসের অবস্থানে এখনো বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পরও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর কার্যালয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, হামাস প্রকৃত অর্থে নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের ভাষ্য, “হামাসের প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া কোনো ধরনের সেনা প্রত্যাহার হবে না।” এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, যুদ্ধবিরতির সম্ভাব্য চুক্তির ক্ষেত্রেও ইসরায়েল নিরাপত্তা ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্যদিকে, হামাসও শান্তি প্রস্তাব নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ আলোচক গাজি হামাদ বলেছেন, ইসরায়েল আগে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করলে হামাস অস্ত্রসংক্রান্ত কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
দুই পক্ষের অবস্থানে দৃশ্যমান মতপার্থক্য থাকলেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আলোচকরা এখনো সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা সম্ভাব্য সমঝোতার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি উদ্যোগে প্রায় তিন বছর ধরে চলা গাজা সংঘাতের অবসানে ১৫ দফা পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মানবিক সহায়তা এবং সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে গঠিত বোর্ড অব পিস গাজা শাসনের জন্য ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি গাজার বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব নেবে। বর্তমানে কমিটির কার্যক্রম মিসর থেকে পরিচালিত গাজায় নতুন শান্তি পরিকল্পনা: ট্রাম্পের প্রস্তাব ঘিরে মতবিরোধ, সতর্ক ইসরায়েল ও হচ্ছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলারের ভাষায়, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হলে তা হবে “ঐতিহাসিক ও অবিশ্বাস্য” একটি সাফল্য। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন আলোচনার বাস্তবতা সব সময়ই ধীরগতির। তাঁর মতে, এ ধরনের আলোচনায় গতি বলতে সাধারণত দুটি মাত্র স্তর থাকে, “ধীর” এবং “আরও ধীর”।
শুরুতেই মতবিরোধ
পরিকল্পনা প্রকাশের পরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়ে দেয়, হামাসের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ প্রস্তাব ইসরায়েলের নিরাপত্তা চাহিদা পূরণ করছে না।
এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউসও। এক মুখপাত্র বলেন, মূল চুক্তি অনুযায়ী জিম্মিদের মুক্তি এবং যুদ্ধের সমাপ্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো পক্ষ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প “খুবই হতাশ” হবেন।
বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বোর্ড অব পিসের গাজাবিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, এ সমঝোতায় পৌঁছাতে কয়েক মাসের কঠিন আলোচনা হয়েছে। তবে তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিরপেক্ষ যাচাই।
২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ২০ দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। এরপর থেকে প্রায় ১ হাজার ১৮০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩ হাজার ৮০০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ইসরায়েলের পাঁচ সেনা নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে দেশটি। আহত সেনাদের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজা সিটির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভবনগুলোর পাশ দিয়ে চলাচল করছেন ফিলিস্তিনিরা। ছবি: বাশার তালেব/এএফপি
বিশ্লেষকদের মতে, আগের চুক্তি পুরোপুরি সফল না হওয়ায় নতুন পরিকল্পনার সফলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
হামাসের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনের দায়িত্ব তদারকির জন্য এনসিএজি গঠন করেছেন। হামাস এ উদ্যোগ নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছে।হামাসের জ্যেষ্ঠ আলোচক গাজি হামাদ বলেন, গাজার মানুষের স্বার্থে সংগঠনটি প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে প্রস্তুত।তিনি বলেন, “নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে ইসরায়েল হস্তক্ষেপ করবে না। এ দায়িত্ব পালন করবে জাতীয় কমিটি।”
তাঁর দাবি, অস্ত্র ইস্যুতে একটি সমঝোতা হয়েছে। তবে সেটি বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে গাজা থেকে প্রত্যাহারের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, হামাস সত্যিই পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণে সম্মত হলে তা সংগঠনটির প্রায় চার দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর হাত ধরে কথা বলছেন। ছবি: চিপ সোমোডেভিলা/পুল/এএফপি
কাতার ও তুরস্ককে নিয়ে আপত্তি
গাজার নির্বাহী বোর্ডে কাতার ও তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছে ইসরায়েল।এর জবাবে হোয়াইট হাউস বলেছে, মিসরের পাশাপাশি কাতার ও তুরস্ক যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে সরে আসা যাবে না।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও বিভক্তি
ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা গাদি আইজেনকট অভিযোগ করেছেন, বোর্ড অব পিসের আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি জনগণের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তাঁর মতে, এতে প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েল আদৌ এ প্রক্রিয়ার অংশীদার কি না।
সরকারি জোটের ভেতরেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এ পরিকল্পাকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি ভবিষ্যতে হামাসকে আবারও হামলার সুযোগ করে দেওয়ার শামিল।
অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা ও অর্থমন্ত্রী গাজা উপত্যকায় নতুন তিনটি সুরক্ষিত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা শান্তি পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
হামাসের ভেতরেও ভিন্ন মত

ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন জোট সরকারের ভেতরে মতবিরোধ ও অস্বস্তি বাড়ছে। ছবি: গেটি ইমেজেস/এএফপি
ইরানে হামাসের প্রতিনিধি খালেদ কাদ্দুমি বলেছেন, “ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ কখনোই তাদের অস্ত্র ত্যাগ করবে না” এবং এ বিষয়টি কোনো আলোচনার অংশ হওয়া উচিত নয়।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের (পিআইজে) প্রতিনিধি আলী আবু শাহিনও দাবি করেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা সঠিক নয়।
তবে হোয়াইট হাউস এসব বিরোধপূর্ণ বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাদের দাবি, হামাস এখন নিজেদের এবং গাজার মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।
আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় বাধা
বিশ্লেষকদের মতে, পুরো পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থার ওপর। হামাস, ইসরায়েল এবং মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি কাটাতে না পারলে বাস্তবায়ন কঠিন হবে।কার্নেগি এনডাউমেন্টের অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, পরিকল্পনাটি সফল হলে তা অবশ্যই ইতিবাচক হবে। তবে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার ও হামাস সত্যিই এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আন্তরিক কি না, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে, সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মার্টিন কিয়ারের মতে, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও অস্ত্র ত্যাগে সম্মত হওয়া হামাসের একটি কৌশলগত পদক্ষেপও হতে পারে। এতে সংগঠনটি সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ভবিষ্যতে নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা। সফল না-ও হতে পারে, তবে এটি ভেস্তে দেওয়ার দায় ইসরায়েলের নেওয়া উচিত হবে না।তবে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভির এখনো তাঁর অবস্থানে অনড়। তাঁর মতে, গাজার সমস্যার সমাধান শান্তি পরিকল্পনা নয়, বরং সেখানকার মানুষের স্থানান্তর উৎসাহিত করা।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস আশাবাদী। তাদের দাবি, জিম্মি ও নিহতদের মরদেহ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে হামাস আগের চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে। এবারও যুক্তরাষ্ট্র চায়, উভয় পক্ষ নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করুক এবং একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তারা সেই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে।
সূত্র: নিউজ ডট কম এইউ