নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এর প্রতিরক্ষা সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব মন্তব্য করেন ডেনিস আলিপভ।ছবি: সংগৃহীত
ভারতকে ভবিষ্যতে চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে দিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র, এমন দাবি করেছেন ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ। তার ভাষ্য, চলতি বছরের রাইসিনা সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ভারতকে ‘পরবর্তী চীন’ হতে দেবে না। আলিপভ ওই বক্তব্যকে ‘অজান্তে সত্য প্রকাশ’ বা ‘ফ্রয়েডিয়ান স্লিপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রবিবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এর প্রতিরক্ষা সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব মন্তব্য করেন ডেনিস আলিপভ। তিনি দাবি করেন, রাইসিনা সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ভারতকে পরবর্তী চীনে পরিণত হতে দেবে না।’ আলিপভের ব্যাখ্যায়, এখানে ‘পরবর্তী চীন’ বলতে এমন একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়েছে, যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে।
আলিপভের মতে, ভারত যত শক্তিশালী হবে এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করবে, ততই দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়তে পারে। তিনি দাবি করেন, ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওয়াশিংটন বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে এসব মন্তব্য রুশ রাষ্ট্রদূতের নিজস্ব মূল্যায়ন ও দাবি হিসেবে এসেছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আলিপভ। তিনি ‘লিন্ডসে গ্রাহাম রাশিয়া ও ইরানকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আইন, ২০২৬’-এর কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই আইনের মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর ওপরও শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আলিপভ এই পদক্ষেপকে ভারতের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অগ্রগতির ওপর চাপ সৃষ্টির একটি উপায় হিসেবে দেখছেন।
ভারতের রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়টিও আলোচনায় আনেন রুশ রাষ্ট্রদূত। তার দাবি, ভারত রাশিয়ার স্বার্থে নয়, বরং নিজেদের অর্থনীতি ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনা করেই রাশিয়ার তেল কিনছে। আলিপভ বলেন, রাশিয়ার তেল প্রতিযোগিতামূলক দামে পাওয়া যায় এবং সে কারণেই ভারত নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তিনি ভারতের এই অবস্থানকে দেশটির কৌশলগত স্বাধীনতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ডেনিস আলিপভ একই সঙ্গে ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তার মতে, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং দীর্ঘদিনের সহযোগিতাই দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও ভারত ও রাশিয়া তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে শর্তযুক্ত করেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আলিপভ জানান, আগামী বছর ভারত ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর পূর্তি হবে। তার ভাষ্য, দীর্ঘ এই সময়ে দুই দেশ পরস্পরকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছে। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে কখনোই এমনভাবে দেখা হয়নি যে এক পক্ষের লাভ মানেই অন্য পক্ষের ক্ষতি।
সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের কথাও উল্লেখ করেন আলিপভ। তার মতে, ব্রিকসের বিভিন্ন আলোচনাও দেখিয়েছে যে সদস্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে চায়। একই সঙ্গে তারা এমন একটি আন্তর্জাতিক আলোচনার প্ল্যাটফর্ম চায়, যেখানে বিভিন্ন দেশের মতামত গুরুত্ব পাবে এবং অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।
রুশ রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য, ভারত ও রাশিয়া ভবিষ্যতেও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে আগ্রহী। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সুত্রঃ এনডিটিভি