গ্রিনল্যান্ড দখলের পুরোনো পরিকল্পনা থেকে সরে এসে নতুন নিরাপত্তা চুক্তিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিতে নতুন কিছু যোগ হওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে গ্রিনল্যান্ডের তেল, খনিজ ও বিরল মাটির সম্পদে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সম্ভাব্য প্রবেশাধিকার। এরই মধ্যে দ্বীপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারে উত্থান দেখা গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প আর্কটিক অঞ্চলের এই স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার কথা বলে আসছিলেন। এমনকি একে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
প্রায় ৫৬ হাজার মানুষের বসবাস গ্রিনল্যান্ডে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি দ্বীপটির বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুদও ট্রাম্পের আগ্রহের অন্যতম কারণ।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান একপর্যায়ে ডেনমার্কসহ ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছিল।
তবে এখন নতুন একটি নিরাপত্তা চুক্তিকে নিজের বিজয় হিসেবে তুলে ধরছেন ট্রাম্প।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যা গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ দিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের উদ্বেগের সমাধান করেছে।
নতুন চুক্তিতে আসলে কী পেল যুক্তরাষ্ট্র?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে শনিবার চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির অনেক বিষয়ই কার্যত নতুন নয়।
চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারবে। কিন্তু ১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশটির এ ধরনের অধিকার রয়েছে।
পুরোনো শীতল যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বিমানঘাঁটি ও নজরদারি কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করার সুযোগও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। এসব অধিকারও আগে বাতিল করা হয়নি।
এ ছাড়া কোনো ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ’ যাতে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে না পারে, সে বিষয়েও নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যেই এমন বিধিনিষেধ আগে থেকেই কার্যকর ছিল।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত অনুমতি ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে ‘সংবেদনশীল বিনিয়োগ’ করা যাবে না।
এর ফলে দ্বীপটির তেল, খনিজ ও বিরল মাটির সম্পদে চীনসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর প্রবেশাধিকার আরও কঠিন হতে পারে। ডেনমার্ক এর আগেও গ্রিনল্যান্ডে কৌশলগত অবস্থান তৈরির জন্য চীনের বিভিন্ন উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
চুক্তির খবর প্রকাশের পর গ্রিনল্যান্ডের বিরল মাটি ও খনিজ সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে।
নজর এখন অর্থনীতিতে
টেক্সাসভিত্তিক কোম্পানি গ্রিনল্যান্ড এনার্জির প্রধান নির্বাহী রবার্ট প্রাইস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিরল মাটির খনিজের ক্ষেত্রে চীন বা রাশিয়ার ওপর নির্ভর করতে চায় না।
তার ভাষায়, গ্রিনল্যান্ডে তেল অনুসন্ধানের অন্যতম কারণ হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের বর্তমান অনিশ্চয়তা।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জি ইতোমধ্যেই সেখানে তেল অনুসন্ধানে সক্রিয়। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে অনুমতি ছাড়া ড্রিলিং সরঞ্জাম আমদানির অভিযোগে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের কর্তৃপক্ষ কোম্পানিটিকে ভর্ৎসনা করে।
এর ফলে কোম্পানিটির প্রায় ৬ কোটি মার্কিন ডলারের অনুসন্ধান কর্মসূচি অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে যায়।
সে সময় গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও বেশ উত্তপ্ত ছিল।
নতুন চুক্তির পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে পারে বলে আশা করছেন কোম্পানিটির কর্মকর্তারা।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রডেরিক ম্যাকিলরি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন কোনো খাতে আগ্রহ দেখান, তখন বিনিয়োগকারীরাও সেটিকে গুরুত্ব দেন এবং সেখানে অর্থ ঢালতে আগ্রহী হন।

জানুয়ারিতে গ্রিনল্যান্ডের নুকে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডনীতি নিয়ে বিক্ষোভ করছেন স্থানীয়রা।
ছবি: এপি/ইভগেনি মালোলেতকা
ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক
গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ ঘিরে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির কর্মকর্তা ম্যাকিলরি একই সঙ্গে লন্ডনভিত্তিক ৮০ মাইল রিসোর্সেসের নির্বাহী পরিচালক। দুটি কোম্পানি মিলে গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জেমসন ল্যান্ড বেসিনে তেল অনুসন্ধানের অধিকার ধরে রেখেছে।
এই এলাকায় প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ তেল মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন ক্যারল ক্রেইগ। তিনি একই সঙ্গে মহাকাশ ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, যেটিকে ট্রাম্পের প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে কাজ করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডে নতুন রাডার স্থাপনের বিষয়টিও ওই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত।
এ ছাড়া ধনকুবের হেজ ফান্ড বিনিয়োগকারী কেনেথ গ্রিফিন ২০২৪ সালের ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে ১০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। গ্রিনল্যান্ড এনার্জির প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ মালিকানাও তার রয়েছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক ফিল ম্যাকগ্রাওকেও সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ড এনার্জির একটি বিপণনধর্মী তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়ার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ সোরিয়াল এবং ট্রাম্পের সাবেক ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী কিথ শিলারও গ্রিনল্যান্ডের বিরল মাটি ও অন্যান্য খনিজ অনুসন্ধান প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির নির্বাহী চেয়ারম্যান ল্যারি সোয়েটস বলেছেন, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ‘প্রভাববলয়ের’ অংশ হিসেবে তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।
তিনি Bloomberg-কে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে ট্রাম্প মার্কিনদের সচেতন না করলে তার পক্ষে বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহ করা আরও কঠিন হতো।
ইউরোপে আস্থার সংকট কতটা কাটল?
আটলান্টিক কাউন্সিলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক টোরি টসিগের মতে, ডেনমার্কের মতো প্রতিষ্ঠাতা ন্যাটো সদস্যের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান আন্তঃআটলান্টিক সম্পর্কে আস্থার ক্ষতি করেছে।
নতুন চুক্তি ইউরোপীয় মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো প্রতিশ্রুতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল ফ্রিডের মতে, নতুন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগের ‘হুমকি ও আগ্রাসী বক্তব্য’ থেকে সরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে।
তার মতে, গ্রিনল্যান্ডে নতুন মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য স্বাগত জানানোর মতো হলেও তা বড় কোনো পরিবর্তন নয়।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দন করছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ২২ সেপ্টেম্বরের ছবি।
ছবি: ম্যাডস ক্লাউস রাসমুসেন/রিটজাউ স্ক্যানপিক্স/এএফপি
চুক্তি কি সত্যিই নতুন কিছু দিয়েছে?
আটলান্টিক কাউন্সিলের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান বায়োমির মতে, ট্রাম্প চুক্তিটিকে বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরলেও এর বাস্তব পরিবর্তন সীমিত।
তার বক্তব্য, চুক্তিতে যেসব বিষয় অর্জন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকটাই আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। বাকি বিষয়গুলোও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব ছিল, এর জন্য চাপ বা হুমকির প্রয়োজন ছিল না।
তবে নতুন চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের ‘সংবেদনশীল’ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্রদের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ইউরোপীয় নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্রের বিশ্লেষক শ্যারন হাডসন-ডিন বলেন, কাগজে-কলমে এটি কঠোর বিধিনিষেধ হলেও বাস্তবে সেটি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়।
এখনও কোনো আন্তঃদেশীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। এ বিষয়ে আলাদা কোনো প্রশাসনিক কাঠামো বা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তিটি এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এর জন্য কোপেনহেগেন ও নুকের পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। অতীতে এ ধরনের অনুমোদন পেতে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় লেগেছে।
সামনে বড় বাধা খোদ গ্রিনল্যান্ডের ভূগোল
চুক্তি হলেও গ্রিনল্যান্ডের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত উত্তোলন করা সহজ হবে না।
বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোর একটি গ্রিনল্যান্ডে খনি ও তেল উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনও সীমিত।
তার ওপর আর্কটিকের কঠোর আবহাওয়া সেখানে রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণকে অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ইমরান বায়োমির ভাষায়, গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ যতই আকর্ষণীয় হোক, সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফলে ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বিজয়’ আপাতত মূলত একটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমঝোতা। এর প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য নির্ভর করবে গ্রিনল্যান্ডের খনিজ ও জ্বালানি সম্পদে বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ করা যায় এবং সেই সম্পদ কতটা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হয়, তার ওপর।
সূত্র: নিউজ.কম.এইউ