বাংলাদেশ

অপ্রতিম হত্যা: আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

  • 3:33 pm - September 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১১৪ বার
কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম।

আইফোনের লোভেই কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলে অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আইফোন নেওয়াকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় তাকে।

অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন, ১৯ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তিনটি জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল পাওয়া গেছে। তবে হত্যার পর কে কোথায় গিয়েছিল এবং ঘটনার কয়েকটি অংশের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে।

তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তুহিনের বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যেত।

তুহিনের দাবি, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ তৈরি হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে তাদের দুজনের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তুহিন জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইফোন নেওয়ার জন্য তুহিনই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।

অপর কিশোর কামরুলের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। সে জানিয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার এক বন্ধু তাকে জানায়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ তিন আসামির বক্তব্যেই একটি বিষয়ে মিল রয়েছে, হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি। আইফোনকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তাদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

তুহিনের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই টিকটকে অপ্রতিমকে বার্তা পাঠান তুহিন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেখানে যোগাযোগ হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ছবি তোলা। ছবি তোলার এই পরিচিতি ও সম্পর্ককেই কাজে লাগিয়ে অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয় বলে তিন আসামির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হয় বলে তুহিন জানিয়েছেন। এরপর তাকে বুঝিয়ে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই জায়গাটি নির্জন এবং তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, দুপুর ২টার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধু কামরুলকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই সে কামরুলকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

কামরুলের বক্তব্যও অনেকটা একই। সে জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার সঙ্গে ওই কিশোরের দেখা হয়। সেখানেই তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এরপর বিকেল ৪টার পর তারা পাহাড়ে যায় এবং সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।

পাহাড়ে যাওয়ার পর অপ্রতিমের আইফোন নেওয়াকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম ফোনটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে দেয়। তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের বর্ণনা রয়েছে। এরপর ফোনটি আর অপ্রতিমকে ফেরত না দেওয়ায় তার সঙ্গে তুহিনের কথা কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশও এর আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম তার আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপর তাদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়।

তিন আসামির জবানবন্দিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে হামলার ঘটনায়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তুহিনই প্রথম অপ্রতিমকে আঘাত করেন। প্রথমে তাকে থাপ্পড় মারা হয়। পরে পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন তুহিন। এরপর অন্য দুজনকেও তাকে মারার জন্য বলা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফাহাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়া হওয়ার পর তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। কামরুলও তার জবানবন্দিতে তুহিনকেই প্রথম হামলাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েও তিন জবানবন্দিতে মিল পাওয়া গেছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল। ফাহাদ দাবি করেছে, পরিকল্পনা ছিল আইফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা ভাগ করে নেওয়ার। কামরুলের বক্তব্যেও আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আসামিরা কে কোথায় গিয়েছিল, সে বিষয়ে তাদের জবানবন্দিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তুহিনের ভাষ্য, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। অন্য একটি জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়, তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান। তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল বলে তিনজনের বক্তব্যেই উঠে এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়ামের বিষয়েও তথ্য এসেছে। তুহিনের দাবি, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে সব ঘটনা জানান। সিয়াম হত্যার পরিকল্পনার বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি। পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিয়াম সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

হত্যার পরদিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও জবানবন্দিতে বিভিন্ন তথ্য এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান। অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরও জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার একজন সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়েছিল।

পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে আসামিদের একজন ঘটনাস্থলে যায় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। কামরুল জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়।

পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। মামলার তদন্তে আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির পাশাপাশি অন্যান্য তথ্য-প্রমাণও যাচাই করা হচ্ছে।

এই শাখার আরও খবর

বিএনপি সরকার উৎখাত করে ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনের ছক, যেভাবে করা হচ্ছে পরিকল্পনা

বাংলাদেশে বিএনপি সরকারকে সরিয়ে একটি ‘বিপ্লবী সরকার’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন একটি জোট দুই ধাপে পরিকল্পনা করছে বলে দাবি করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেল।…

স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় হাসপাতালে গিয়ে গ্রেফতার ছাত্রলীগ নেতা

চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় উপস্থিত থাকা অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছেন হাটহাজারী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাসান। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে…

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্য পদ চায় রাশিয়া

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির প্রতি আবারও সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ নিরাপত্তা…

বিশ্বজুড়ে স্কুলে মোবাইল নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশে কী করবে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বাড়ছে। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমে যাওয়া, সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং অতিরিক্ত…

কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, চাপে বাংলাদেশসহ চার দেশ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। এর মধ্যে কাতার…

রামু হামলার ১৪ বছর, বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে ভয়াবহ হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হলেও এখনো শেষ হয়নি বিচারপ্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময়েও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au