'ফোর্সেস গোল ২০৩৬' বাস্তবায়নে ৭ বিলিয়ন ডলার।
মেলবোর্ন,০১ আগস্ট: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্যের প্রেক্ষাপটে দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকার একটি দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। ‘ফোর্সেস গোল ২০৩৬’-এর আওতায় প্রণীত এই কর্মসূচিকে দেশের ইতিহাসে প্রতিরক্ষা খাতে অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিকল্পনার লক্ষ্য আগামী এক দশকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর আধুনিক যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ঘটানো এবং বিদেশি সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কর্মসূচির আওতায় আধুনিক যুদ্ধবিমান, অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মানববিহীন আকাশযান (ড্রোন) সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দেশেই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’-র সুরক্ষা, উপকূলীয় সম্পদের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর বাড়তে থাকা উপস্থিতির কারণে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ভারত, চীন এবং অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতার ফলে সামরিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বহুমাত্রিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। শুধু যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি আধুনিক বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা জোরদার, সামুদ্রিক যোগাযোগপথের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং সমুদ্রাঞ্চলে নজরদারি সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশীয় শিল্পভিত্তি গড়ে তোলাও এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার ড্রোনসহ বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তি দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এর ফলে বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এত বড় প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ নিয়ে দেশে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের মতো খাতের চাহিদার পাশাপাশি বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ কীভাবে এই উচ্চাভিলাষী সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে এর ভারসাম্য বজায় রাখে এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে এর কী প্রভাব পড়ে, সেদিকে প্রতিবেশী দেশসহ আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে।