বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব মোকাবিলায় নজরদারি জোরদারের সুপারিশ থারুর কমিটির।
মেলবোর্ন,০১ আগস্ট: ভারতে কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারকে আরও সক্রিয় হওয়ার সুপারিশ করেছে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে, একই সঙ্গে দেশটিতে বিদেশি শক্তির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কমিটির মতে, কোনো “অবন্ধুসুলভ দেশ” যদি বাংলাদেশে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলার চেষ্টা করে, তবে তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বৃহস্পতিবার ভারতের পার্লামেন্টে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে কমিটি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর নির্মাণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণে ২০২৫ সালের মার্চে চীনের সঙ্গে হওয়া প্রায় ৩৭ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি এবং লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে।
কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে নেই। তবুও ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করায় প্রকল্পটি কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পেকুয়ায় চীনের সহায়তায় নির্মিত সাবমেরিন ঘাঁটির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘাঁটিটিতে সর্বোচ্চ আটটি সাবমেরিন রাখার সক্ষমতা রয়েছে, যদিও বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে দুটি সাবমেরিন রয়েছে। এই সক্ষমতা ভবিষ্যৎ কৌশলগত পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার চীন সফর বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সম্পর্ক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। কমিটির মতে, এটি চীনের বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রতিফলন।
তবে একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, যে কোনো দেশের মতো বাংলাদেশও একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। কিন্তু ভারতের উচিত নিজের কৌশলগত স্বার্থ, বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডোর এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
কমিটি ভারতের সরকারকে বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে, যাতে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারত ইতোমধ্যে খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণে অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন করেছে এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ট্রানজিট ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে একাধিক চুক্তি করেছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের বৈঠকে উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে একমত হন।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, উগ্রবাদ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) যৌথ টহল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং হটলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা, মোশন সেন্সর এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করেছে কমিটি। পাশাপাশি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানের মতো সমস্যার মূল কারণগুলোও মোকাবিলা করতে হবে। এজন্য বর্ডার এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম আরও সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটি।
সুত্রঃ ফাস্টপোস্ট