মেলবোর্ন, ১ আগস্ট: বাংলাদেশ সফররত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সের্জিও গর ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
শুক্রবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি এমন সময়ে হলো, যখন বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন দিনেশ ত্রিবেদী। দায়িত্ব গ্রহণের সময়ই সের্জিও গর তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদারে তিনি ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করছেন।
সের্জিও গর বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে আসেন। ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক কৌশল, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা এবং ভারতের কৌশলগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে কূটনৈতিক মহলে মনে করা হয়।
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রস্তাবিত মিয়ানমার মানবিক করিডোরসহ বিভিন্ন বিষয়ও ওয়াশিংটনের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, সফরকালে সের্জিও গর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক ভূমিকাসহ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করবেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই সফরকে “অনুসন্ধানধর্মী” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত বাংলাদেশকে আরও গভীরভাবে জানার লক্ষ্যেই এই সফরে এসেছেন। সফরের অংশ হিসেবে সের্জিও গরের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনেরও কর্মসূচি রয়েছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।
রোহিঙ্গা সংকটেও যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রদানে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক দাতা দেশ। এ ছাড়া জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের আপত্তির পর সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সের্জিও গর ওয়াশিংটন থেকে সফর করা তৃতীয় জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা। এর আগে মার্চে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ বাংলাদেশ সফর করেন।
এদিকে সের্জিও গরের সঙ্গে বৈঠকের আগে বুধবার ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম-এর সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।