সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার পরও অস্ট্রেলিয়া।
মেলবোর্ন, ১ আগস্ট: অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিশ্বের প্রথম জাতীয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার প্রায় ছয় মাস পরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যাচ্ছে। দেশটির ই-সেফটি কমিশন (eSafety Commission) পরিচালিত প্রথম বড় ধরনের মূল্যায়নে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পরও ১৬ বছরের কম বয়সী ৪২ দশমিক ১ শতাংশ শিশু-কিশোর এখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আইন কার্যকর হওয়ার আগে ১৬ বছরের কম বয়সী ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ছিল। আইন কার্যকর হওয়ার পর সেই হার কমে ৪২ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এলেও বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী এখনও টিকটক, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, যারা এখনও এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, তাদের প্রায় অর্ধেকের কাছ থেকে বয়স যাচাইয়ের কোনো প্রমাণই চাওয়া হয়নি। অর্থাৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বয়স যাচাই ব্যবস্থা এখনও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
এ ছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া শিশু-কিশোরদের প্রতি তিনজনের একজন জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তারা জন্মতারিখ পরিবর্তন করে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে প্রতি পাঁচজনের একজন বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তাদের বয়স ভুলভাবে বেশি হিসেবে শনাক্ত করায় তারা কোনো বাধা ছাড়াই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার চালিয়ে যেতে পেরেছেন।
একচেটিয়া এক পাঠক জরিপে নাইন ডটকম ডটএইউ-এর প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি পাঠক এই নিষেধাজ্ঞাকে এখন পর্যন্ত অকার্যকর বলে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতায় আইনটি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে যেসব অস্ট্রেলীয় কিশোর-কিশোরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করত, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনও কোনো না কোনোভাবে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে পারছে। একই সময়ে ই-সেফটি কমিশন জানিয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে সাইবার বুলিং ও ছবি-ভিত্তিক অনলাইন নির্যাতনের অভিযোগে উল্লেখযোগ্য কোনো হ্রাস দেখা যায়নি।
তবে আইন কার্যকরের পর বয়সসীমার আওতাভুক্ত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ৪৭ লাখেরও বেশি অ্যাকাউন্ট অপসারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। যদিও অনেক কিশোর-কিশোরী জানিয়েছেন, তাদের অ্যাকাউন্টে কোনো ধরনের প্রভাব পড়েনি এবং তারা আগের মতোই ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, ফেসবুক ও রেডিটসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অনেক কিশোর-কিশোরী জানিয়েছেন, এর ফলে সংবাদ ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা কমে গেছে।
অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনার জুলি ইনম্যান গ্র্যান্ট মে মাসে বলেন, আইন বাস্তবায়নে অগ্রগতি হচ্ছে, তবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সমাজে গড়ে ওঠা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব একদিনে দূর করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “অর্থবহ নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন কয়েক মাসে অর্জিত হয় না। বড় ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগে। আমাদের দল প্রতিদিন কাজ করছে যাতে এই আইনের সর্বোচ্চ ইতিবাচক ফল নিশ্চিত করা যায়।”
বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার এই যুগান্তকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এর প্রকৃত কার্যকারিতা এবং শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।