বাংলাদেশ

বাংলাদেশে বাড়ছে গণপিটুনি, বিচার নিয়ে প্রশ্ন

  • 6:14 pm - September 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২১ বার
বাংলাদেশে বাড়ছে গণপিটুনি, বিচার নিয়ে প্রশ্ন।ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে গণপিটুনির ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, বিচার নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান, বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ এবং বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।

গ্লোবাল ভয়েসেসের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে গণপিটুনির প্রবণতা বাড়ার পেছনে দায়মুক্তির সংস্কৃতি, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খানও গণপিটুনির প্রবণতার পেছনে নিয়ন্ত্রণহীন দায়মুক্তিকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় গণপিটুনিতে অন্তত ১৫৪ জন নিহত হয়েছেন। জাতীয় ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং নিজেদের নথির ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে আসক।

পাবনায় শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর হামলা

গণপিটুনির পাশাপাশি জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে পাবনার একটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর পাবনায় ১০ বছর বয়সী কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর বাড়ির কাছের একটি পুকুর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ এ ঘটনায় দুই সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে ১৭ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করে এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। এর পরদিন অভিযুক্তদের একজনের বাড়ির সামনে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে ভাঙচুর চালায়।

পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জনতার সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেয় এবং মূল্যবান জিনিসপত্র রক্ষার চেষ্টা করলেও বাড়ির স্থাপনা ভাঙচুর ঠেকানো যায়নি।

দেশজুড়ে গণসহিংসতার প্রবণতা

গ্লোবাল ভয়েসেসের প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়া এবং বিভিন্ন দাবি আদায়ে সংঘবদ্ধ জনতার ব্যবহার বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করার কথা জানিয়েছিল টিআইবি।

বাংলাদেশ

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও গণসহিংসতার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে টিআইবি জানায়, মার্চ ও এপ্রিল মাসে সারাদেশে ৬৯ থেকে ৮০টি গণসহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত হন বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জনতার হামলার শিকার সাংবাদিক

গণপিটুনির ঝুঁকি কত দ্রুত তৈরি হতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে সম্প্রচার সাংবাদিক রিফাত আলম রিশানের অভিজ্ঞতাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাজনৈতিক কর্মী ও তৎকালীন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদীকে গুলি করার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহ করতে যান রিফাত আলম রিশান। সেখানে উপস্থিত জনতার একাংশ তাকে হাদীর ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করে।

রিশানের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর একদল মানুষ তার ওপর হামলা চালায়। তাকে মারধর করে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি রাস্তায় পড়ে গেলে হামলাকারীরা তার মোবাইল ফোন নেওয়ারও চেষ্টা করে। পরে সেখানে থাকা আরেকজন টেলিভিশন সাংবাদিক ও অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মী তাকে উদ্ধার করেন।

আরেক সম্প্রচার সাংবাদিক জামাল রুহানী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে একজন বা দুজন ব্যক্তি কাউকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করলে আশপাশের লোকজনও তাতে যোগ দেন। হামলায় অংশ নেওয়া অনেকেই ওই ব্যক্তি সত্যিই অপরাধী কি না, তা যাচাই করেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানি

গণসহিংসতার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় একটি সুফি মাজারে হামলার আগে ইসলাম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে বলে দাবি করা একটি পুরোনো ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ৩৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিও কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়। পুলিশ সকালেই সম্ভাব্য উত্তেজনার বিষয়ে জানতে পেরে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। পরে ওই দিন শতাধিক মানুষ মাজারটিতে হামলা চালায়।

হামলায় মাজারের আধ্যাত্মিক নেতা আবদুর রহমান, যিনি শামীম আল-জাহাঙ্গীর নামেও পরিচিত, নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাজারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়।

ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় চারজনের নাম এবং আরও ১৮০ থেকে ২০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। নাম থাকা আসামিদের মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি, জামায়াতে ইসলামীর একজন স্থানীয় কর্মী এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের স্থানীয় একজন নেতার নাম থাকার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিরা তাদের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিচারব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট

জামাল রুহানীর মতে, মানুষের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতার পেছনে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকটও একটি কারণ হতে পারে। তার ভাষ্য, মানুষ সব সময় নিশ্চিত হতে পারছে না যে আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকর বিচার পাওয়া যাবে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়াও এ ধরনের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে তিনি মনে করেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রুহানী। তার মতে, অনেক এলাকায় গণসহিংসতার পরিস্থিতি তৈরি হলেও পুলিশ সব সময় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে থাকতে পারছে না।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজপথের আন্দোলন, মিছিল, সমাবেশ, হরতাল ও অবরোধ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং কোনো ব্যক্তিকে আদালতের বিচার ছাড়াই জনতার হাতে শাস্তি দেওয়া এক বিষয় নয়।

গণপিটুনি ঠেকাতে সরকারের পদক্ষেপ

গণপিটুনি ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনা ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকেও কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম কর্মদিবসে জানান, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া সহ্য করা হবে না। একই সঙ্গে আইনসম্মত সভা, সমাবেশ ও গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে বলেও তিনি জানান।

গণপিটুনি প্রতিরোধের বিষয়টি আদালতেও উঠেছে। ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের করা একটি জনস্বার্থ মামলার পর হাইকোর্ট গণপিটুনি ও গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চান। এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়।

এর প্রায় ছয় মাস পর ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গণপিটুনি প্রতিরোধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল বাড়ানো, গোয়েন্দা নজরদারি, সিসিটিভি স্থাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং সরকারের কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পরও গণপিটুনির ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা, হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতাই এখন আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই শাখার আরও খবর

বাংলাদেশসহ ২০ দেশ-অঞ্চলের বিশেষায়িত ওষুধ শুল্কমুক্ত করল যুক্তরাষ্ট্র

বিরল রোগসহ বিশেষ কিছু রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ এবং এসব ওষুধ তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান আমদানিতে বাংলাদেশসহ ২০টি দেশ ও অঞ্চলের জন্য শূন্য শতাংশ শুল্কের সুবিধা…

বিএনপি সরকার উৎখাত করে ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনের ছক, যেভাবে করা হচ্ছে পরিকল্পনা

বাংলাদেশে বিএনপি সরকারকে সরিয়ে একটি ‘বিপ্লবী সরকার’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন একটি জোট দুই ধাপে পরিকল্পনা করছে বলে দাবি করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেল।…

স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় হাসপাতালে গিয়ে গ্রেফতার ছাত্রলীগ নেতা

চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় উপস্থিত থাকা অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছেন হাটহাজারী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাসান। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে…

অপ্রতিম হত্যা: আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

আইফোনের লোভেই কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। জবানবন্দি…

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্য পদ চায় রাশিয়া

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির প্রতি আবারও সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ নিরাপত্তা…

বিশ্বজুড়ে স্কুলে মোবাইল নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশে কী করবে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বাড়ছে। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমে যাওয়া, সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং অতিরিক্ত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au