বাংলাদেশ

লোডশেডিংয়ের প্রকৃত চিত্র আড়াল করছে সরকার

  • 3:38 pm - April 22, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৫৬ বার
লোডশেডিং। প্রতীকী ছবি

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- বাংলাদেশে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বিদ্যুতের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, আর সেই সংকটের বাস্তব চিত্র ও সরকারি হিসাবে বড় ধরনের ফারাক দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শহরে তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহনীয় পরিস্থিতি থাকলেও গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ভয়াবহ আকার নিয়েছে, কোথাও কোথাও দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর প্রকাশিত তথ্যে এই চরম ভোগান্তির পূর্ণ চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না, বরং সরকার লোডশেডিংয়ের হিসাব কম দেখানোর মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

এপ্রিল থেকে জুন মাস সাধারণত দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে চাপের সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও দ্রুত বেড়ে যায়। চলতি বছর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে জ্বালানি সংকট, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি এবং উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাসের কারণে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে অন্তত ছয় থেকে আটটি তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে তিন থেকে চারটি তীব্র তাপপ্রবাহে রূপ নিতে পারে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি চাপের মুখে পড়বে।

কেন এই সংকট

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে দেশেও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিস সময় কমানো, শপিংমল দ্রুত বন্ধ করা এবং অন্যান্য সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে বাস্তবে লোডশেডিং কমেনি, বরং গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তারা দাবি করছে, কয়লা সরবরাহ বাড়ানো এবং বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ শেষ হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল হয়নি।

একই সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকরা সরকারের কাছে দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধের চাপ দিচ্ছেন। ভারতের আদানি পাওয়ারও পাওনা পরিশোধে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডকে (পিডিবি) চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে। তারা সতর্ক করেছে, সময়মতো বকেয়া পরিশোধ না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

বিদ্যুত বিভাগ। ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে মোট ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে বছরের বড় অংশে এর অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা ব্যবহৃত হয় না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৮৮ শতাংশই গ্যাস, তেল ও কয়লাভিত্তিক। জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে ১৮টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, যার মধ্যে ১০টি গ্যাসভিত্তিক এবং ৮টি তেলভিত্তিক। এছাড়া আরও ৩৫টি কেন্দ্র আংশিক উৎপাদনে রয়েছে, ফলে মোট উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

চলতি গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করেছে পিডিবি। বর্তমানে গড় চাহিদা ১৫ থেকে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। এই ঘাটতি থেকেই নিয়মিত লোডশেডিং তৈরি হচ্ছে।

লোডশেডিংয়ের তথ্য নিয়েও বিতর্ক

লোডশেডিংয়ের তথ্য নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) নিয়মিতভাবে বিদ্যুতের চাহিদা, উৎপাদন ও ঘাটতির তথ্য প্রকাশ করলেও বিতরণ পর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে এর মিল পাওয়া যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে দেখা গেছে, এক দিনে পিজিসিবি যেখানে সর্বোচ্চ ঘাটতি দেখিয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯১২ মেগাওয়াট, সেখানে অন্য একটি হিসাব অনুযায়ী ঘাটতি আরও বেশি বা কম দেখানো হয়েছে। আবার পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে ঘাটতি পিজিসিবির তুলনায় অনেক বেশি দেখা গেছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে আবার ডেসকো ও ডিপিডিসিকে তুলনামূলকভাবে বেশি বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয়, যাতে রাজধানীতে লোডশেডিং কম থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যগত অসামঞ্জস্য শুধু প্রশাসনিক বিভ্রান্তিই তৈরি করছে না, বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকৃত লোডশেডিং চিত্র আড়াল করতে কোথাও কোথাও চাহিদার হিসাব কম দেখানো হচ্ছে।

পিডিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী করা যাচ্ছে না। ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন সীমিত রাখা হচ্ছে। তবে তিনি লোডশেডিংয়ের তথ্য নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস ও তেলের সংকট অব্যাহত থাকলে এবং তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করছে।

কোথায় কেমন প্রভাব

এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক পরীক্ষার্থী রাতে পড়াশোনা করতে পারছে না।

চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও অভিযোগ করেছেন, লোডশেডিংয়ে তাদের ঠিকমতো পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষি খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেচনির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে পাম্প চালানো যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় ফসল উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ধানসহ প্রধান ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

শিল্প খাতেও এর প্রভাব মারাত্মক। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক এবং সিমেন্ট শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে সময়মতো রপ্তানি অর্ডার পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা দেশের রপ্তানি আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করছে।

এই শাখার আরও খবর

ধামরাইয়ের ৫২০ কেজির অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা, হবে না বিসর্জন

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: ঢাকার ধামরাইয়ের বণিকবাড়িতে ৫২০ কেজি ওজনের অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমার পূজা চলছে। আগামীকাল বুধবার পূজা শেষে এটি দেওয়া হবে না বিসর্জন। এটিই এখানকার রীতি।…

শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন, আতঙ্কে বিদেশগামী যাত্রীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)…

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে…

মসজিদে বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য খতিবের, নিরব প্রশাসন

ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকার টানপাড়ার জামতলা জামে মসজিদে জুমার বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রসাদ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে মসজিদটির অস্থায়ী খতিব…

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au