বাংলাদেশ

ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

দুই চোখ ছিল না আগামী চক্রবর্তীর, ঘাড়ে ছিল কোপের আঘাত, শরীরে ছিল না পোষাক

  • 10:56 pm - August 24, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৭৩২৪ বার
হিন্দু শিক্ষকের বাড়ি থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৪ আগষ্ট- রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্যের বাইরে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিশেষ করে নিহত মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহের অবস্থা ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। গত শনিবার(২২ আগষ্ট) রাতে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে স্বজন ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের কাছ থেকে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহের ভয়াবহতার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, মরদেহ উদ্ধারের সময় আগামী চক্রবর্তীর শরীরের বেশ কিছু অংশে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর চোখ ও ঘাড়ে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, হত্যাকান্ডের শিকার আগামী চক্রবর্তীর লাশের নীচের অর্ধেক অংশ বিবস্ত্র অবস্থায় ছিল। তার দুই চোখ উপরে ফেলা হয়েছিল। পাশাপাশি তার মুখ ও প্রাইভেট পার্টগুলো ঝলসানো ছিল। নিহতের মধ্যে প্রায় সবাইকেই বিবস্ত্র অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।

লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ স্বজন ও প্রতিবেশিদের লাশের কাছে যেতে দেয়নি। এরপর লাশ উদ্ধারের পর ময়না তদন্ত শেষে লাশ হস্তান্তরের সময় লাশের অবস্থা দেখে আতংকিত হয়ে পড়েন স্বজনরা।

স্বজনদের দাবি, মরদেহে থাকা আঘাতের ধরন নিয়ে তাঁদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর ওপর যৌন নির্যাতন হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টিও তাঁরা জানতে চাইছেন। তবে পুলিশ তাদের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেয়নি।

ঘটনাস্থলে থাকা সূত্রগুলো জানায়, চারজনের মরদেহের অবস্থানও ছিল আলাদা। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় বাড়ির ছাদে। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ ছিল সিঁড়ির কাছে। আর ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় ঘরের ভেতরে।

মরদেহ উদ্ধারের সময় পুলিশ স্বজন ও স্থানীয়দের ঘটনাস্থলের কাছে যেতে দেয়নি। পরে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্বজনেরা মরদেহের অবস্থা দেখে আরও হতবাক হয়ে পড়েন বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

হিন্দু শিক্ষকের বাড়ি থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার। ছবিঃ সংগৃহীত

চাঁদাবাজির বিরোধের অভিযোগ

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও নতুন করে সামনে এসেছে। ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে গণপতি চক্রবর্তীর কাছে বাড়ি নির্মাণের সময় মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নিহতের স্বজন ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, বাড়ি নির্মাণের সময় থেকেই এ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই প্রভাবশালী ব্যক্তিকে কয়েকজন সহযোগীসহ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আশপাশে দেখা গিয়েছিল বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।

গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীও বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবি নিয়ে বিরোধের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ধারণা, ওই বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

গোপীনাথের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটি এখনো স্বজন ও স্থানীয়দের দাবির পর্যায়েই রয়েছে।

সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়।ছবিঃ সংগৃহীত

পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন

অন্যদিকে পুলিশ শুরুতে ঘটনাটিকে ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ধারণা করলেও পরে তদন্তে ভিন্ন তথ্য পাওয়ার কথা জানায়।

রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশের দাবি, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই যুবক পাশের ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিল।

শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে দাবি পুলিশের। পরে একে একে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ঘুমন্ত ছেলেকেও হত্যা করা হয় বলে জানানো হয়েছে।

পুলিশ আরও দাবি করেছে, হত্যার পর অভিযুক্তরা কিছু সময় বাড়ির ভেতরে অবস্থান করে। পরে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে সেগুলো একটি মন্দিরের পেছনে লুকিয়ে রাখে। তদন্তকে ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা এবং আঙুলের ছাপ নষ্ট করার জন্য দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁরা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

পুলিশের দেওয়া হত্যাকাণ্ডের বর্ণনার সঙ্গে স্বজনদের সন্দেহ এবং ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহে থাকা আঘাতের ধরন, তাঁর মরদেহের অবস্থান এবং তাঁকে ঘিরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে কী পাওয়া যায়, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবির অভিযোগ সত্য কি না, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি কী ছিল এবং পুলিশের গ্রেপ্তার করা দুই যুবকই পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন নিহতের স্বজনরা।

গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি নিজ বাড়িতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিতেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। ছেলে আয়ুশ ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

এ ঘটনায় প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবিতে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন করেছেন। তাঁরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের দাবি জানিয়েছেন।

এই শাখার আরও খবর

মৃত্যুর আগে তাজমিনের চলাচলের সিসিটিভি ফুটেজ, তদন্তে নতুন সূত্র

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন সূত্র পেয়েছে পুলিশ। মৃত্যুর আগের রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় তার…

হলিউডের মেরিলিন, গ্রিক পুরাণের হেলেন: অ্যান কার্সনের ভাবনায় কোথায় মিল?

কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কার্সনের সাহিত্যকর্মে প্রাচীন গ্রিক পুরাণ ও সমকালীন জীবনের এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। ধ্রুপদি সাহিত্যকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন এবং…

রিয়াদের আকাশে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস, ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল ও ক্লিনিক

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে রিয়াদের একটি…

তাজমিনের মৃত্যু ঘিরে রহস্য, ধানক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে ধস্তাধস্তির চিহ্ন

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৪) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধানগাছ এলোমেলো…

রাজস্থানে মহড়ায় একসঙ্গে উড়ল বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিমানবাহিনী

ভারতের রাজস্থানে বহুজাতিক বিমান মহড়া ‘তরঙ্গ শক্তি ২০২৬’-এ একসঙ্গে উড়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ। তিন দেশের উড়োজাহাজ ‘ভিক’ ফরমেশনে উড্ডয়ন করে। এর মধ্য…

ভারতের আনুগত্যের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভিসা সংকট, বাণিজ্যিক বৈষম্য ও নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। এর মধ্যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও সমতার ভিত্তিতে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au