বিশ্ব

কংগ্রেস থেকে বিজেপি, তিন দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী হলেন শুভেন্দু

  • 1:33 pm - May 09, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২২৭ বার
তিন দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৯ মে- ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘ তিন দশকের সক্রিয় রাজনৈতিক যাত্রা পেরিয়ে অবশেষে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন পূর্ব মেদিনীপুরের নেতা শুভেন্দু অধিকারী। কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই রাজনীতিক সময়ের সঙ্গে হয়ে ওঠেন তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান মুখ, পরে যোগ দেন বিজেপিতে। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর তাকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়ার পথে এগিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থানের শুরু নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়। তখন তিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রথম বড় রাজনৈতিক সাফল্য আসে ১৯৯৫ সালে। ওই বছর পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। পরে পৌরসভার চেয়ারম্যানও হন। স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতি থেকেই ধীরে ধীরে রাজ্য রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন শুভেন্দু।

২০০৬ সালে কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা আসন থেকে জয়ী হয়ে প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রবেশ করেন তিনি। এরপর ধাপে ধাপে রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। পূর্ব মেদিনীপুর থেকে এর আগে ১৯৬৭ সালে অজয় মুখোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রায় ছয় দশক পর আবারও এই জেলার একজন নেতা মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসতে যাচ্ছেন।

১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের সময় থেকেই দলটির সঙ্গে যুক্ত হন শুভেন্দু অধিকারী। দীর্ঘদিন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে মমতার আন্দোলনে সামনের সারির নেতা ছিলেন তিনি। বিশেষ করে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি রাজ্যজুড়ে আলোচনায় আসেন।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু । ছবি : সংগৃহীত

২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার জন্য জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে ব্যাপক আন্দোলন। ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র নেতৃত্বে আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন শুভেন্দু। আন্দোলনকে ঘিরে ব্যাপক সংঘর্ষ, সহিংসতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত শিল্পপ্রকল্প বাতিল হয় এবং এই আন্দোলনই বামফ্রন্ট সরকারের রাজনৈতিক ভিত দুর্বল করে দেয়। সেই সময় থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারী আলাদা গুরুত্ব পেতে শুরু করেন।

২০০৯ সালে তমলুক লোকসভা আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে ভারতের পার্লামেন্টে যান তিনি। পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রামোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এরপর আবার রাজ্য রাজনীতিতে ফিরে এসে ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম আসন থেকে জয়ী হন। সেই জয় তাকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা করে দেয়।

তৃণমূল সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে পরিবহনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শুভেন্দু। পরে সেচ ও জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও সামলান। তবে এই সময় থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে।

জয়ের পর শুভেন্দু অধিকারী। ছবিঃ সংগৃহীত

দলের অভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াই, পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং হলদিয়া বন্দরকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো নিয়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। একই সময়ে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগও সামনে আসে। ২০১৪ সালে একটি গোপন ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় শুভেন্দুর বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বহুল আলোচিত চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতেও তার নাম জড়ায়। যদিও তিনি এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।

অবশেষে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর উপস্থিতিতে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি দলের অন্যতম প্রধান মুখে পরিণত হন। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে বিজেপির সবচেয়ে আক্রমণাত্মক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনায় উঠে আসেন শুভেন্দু। যদিও ভোট গণনা নিয়ে তৃণমূল অভিযোগ তোলে এবং সেই মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভবানীপুর আসনেও মমতাকে পরাজিত করার দাবি করে বিজেপি। এই জয়কে বিজেপি ঐতিহাসিক ও প্রতীকী সাফল্য হিসেবে দেখছে।

বিজেপির অভ্যন্তরে শুভেন্দুকে ঘিরে কিছু দ্বিধাও রয়েছে। দলের একাংশের মতে, তিনি মূলত তৃণমূলের রাজনীতি থেকে উঠে আসা নেতা এবং সংগঠনের পুরোনো আদর্শিক কাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্ক তুলনামূলক দুর্বল। অনেকেই তাকে অমিত শাহর ঘনিষ্ঠ বলেই চিহ্নিত করেন। ফলে সরকার ও সংগঠনের সমন্বয় ভবিষ্যতে কেমন হবে, তা নিয়ে দলের ভেতরে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।

অমিত শাহ’র সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী। ছবিঃ সংগৃহীত

শুভেন্দুর পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রভাবশালী। তার বাবা শিশির অধিকারী কংগ্রেস, তৃণমূল ও পরে বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দুই ভাই দিব্যেন্দু ও সৌমেন্দুও সক্রিয় রাজনীতিতে রয়েছেন।

তবে শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। নির্বাচনী প্রচারণায় তাকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে বিরোধীরা। তিনি একাধিকবার হিন্দু ভোটারদের নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এবং বাংলাদেশ থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের’ ফেরত পাঠানোর কথাও বলেছেন। তার সমর্থকদের একাংশ মনে করেন, তিনি আসামের মতো কঠোর নীতি পশ্চিমবঙ্গেও বাস্তবায়ন করতে পারেন। অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কা, এতে রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বাড়তে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ফলে সীমান্তনীতি, নাগরিক পঞ্জি কিংবা কথিত অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে শুভেন্দু অধিকারীর অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

এই শাখার আরও খবর

শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন, আতঙ্কে বিদেশগামী যাত্রীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)…

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে…

মসজিদে বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য খতিবের, নিরব প্রশাসন

ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকার টানপাড়ার জামতলা জামে মসজিদে জুমার বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রসাদ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে মসজিদটির অস্থায়ী খতিব…

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au