বাংলাদেশ

বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ

  • 1:11 pm - July 15, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২২৭ বার
ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৫ জুলাই- দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশকে চীন বা ভারতের কোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক জিল্লুর রহমান। তার মতে, তিস্তা নদী প্রকল্প, সম্ভাব্য চীনা যুদ্ধবিমান ক্রয়, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা ঘিরে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। বরং বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে জিল্লুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তকে ঘিরে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে দেশটি ধীরে ধীরে চীনের দিকে ঝুঁকছে এবং এতে ভারতের উদ্বেগ বাড়ছে। তবে এই ব্যাখ্যা অতিরিক্ত সরলীকৃত। তার মতে, বাংলাদেশ কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার পথে নয়, বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

তিনি উল্লেখ করেন, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প এই বাস্তবতার অন্যতম উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও ২০১১ সালে সমঝোতা হওয়ার পরও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে তা কার্যকর হয়নি। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের মানুষ শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নদী পুনরুদ্ধারে চীনের সহায়তা নিতে বাংলাদেশের আগ্রহকে উন্নয়নমূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

তার মতে, ঢাকার কাছে এটি মূলত বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং নদী ব্যবস্থাপনার একটি প্রকল্প হলেও নয়াদিল্লি বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। কারণ, ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত একটি নদীতে চীনের বিনিয়োগ ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে। তবে উভয় দেশেরই একে অপরের উদ্বেগ বোঝার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্লেষণে সম্ভাব্য চীনের জে-১০সি ই (জে-১০সিই) বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনাও উঠে আসে। জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন সময়ের দাবি এবং প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অধিকার রয়েছে। তবে নতুন যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি শুধু সামরিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বার্তাও জড়িয়ে থাকে।

তিনি মনে করেন, উন্নত চীনা যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করলে তা ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষণে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং বঙ্গোপসাগরে চীনের কৌশলগত উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। তাই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে বৈচিত্র্য আনা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও নিবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, চীন এখনো চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নে আগ্রহী এবং ভবিষ্যতে এতে ভারতসহ অন্যান্য দেশও যুক্ত হতে পারে বলে বেইজিং জানিয়েছে। তবে মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত এবং রোহিঙ্গা সংকটের কারণে এই করিডোর বাস্তবায়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

জিল্লুর রহমানের মতে, মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত বৃহৎ আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। তাই বাংলাদেশের উচিত আপাতত বন্দর উন্নয়ন, লজিস্টিকস অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মতো বাস্তবমুখী প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূল হলে আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগ থেকেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেতে পারে।

নিবন্ধে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়টিকেও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের মতে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার মতো বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে আলোচনা চলছে, তা বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘ বহুদলীয় গণতন্ত্রের নীতি অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকরাও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো কেবল অর্থনৈতিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের ভিত্তিতেও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব মূল্যায়ন করছে। ফলে গণতান্ত্রিক বৈধতা এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বিশ্লেষণের শেষ অংশে জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের উচিত কোনো ভ্রান্ত বিকল্পের ফাঁদে না পড়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করা। তার মতে, চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী, বড় বিনিয়োগকারী এবং অবকাঠামো ও সামরিক সরঞ্জামের অন্যতম সরবরাহকারী। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী, আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান অংশীদার এবং পানি, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও সীমান্ত সংযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রধান অংশীদার। তাই কোনো সম্পর্কই অন্যটির বিকল্প হতে পারে না।

তার মতে, বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নতুন বাস্তবতায় আরও পরিপক্বভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বেইজিং, নয়াদিল্লি, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস কিংবা টোকিও, যে দেশ থেকেই কোনো প্রস্তাব আসুক না কেন, সেটি গ্রহণের আগে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করা উচিত। লেখকের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং কোনো শক্তির প্রতিনিধিতে পরিণত না হয়ে সবার সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা বজায় রাখার সক্ষমতা।

এই শাখার আরও খবর

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au