বিশ্ব

মোজা দেখে শনাক্ত মেয়ের মরদেহ, মিনাবের স্কুলে যুদ্ধের নির্মম সাক্ষ্য

  • 10:36 pm - July 23, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩৪ বার
১২০ শিশুর মৃত্যুতে স্তব্ধ মিনাব।ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: দক্ষিণ ইরানের ছোট শহর মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ আর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং যুদ্ধের নির্মমতার এক নীরব স্মৃতিস্তম্ভ। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের শুরুতেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই বিদ্যালয়ে প্রাণ হারান ১২০ শিশুসহ মোট ১৫৬ জন। নিহতদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং তার অনাগত সন্তানও ছিলেন। ঘটনার কয়েক মাস পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বেঁচে ফেরা শিক্ষক, উদ্ধারকর্মী ও স্বজনদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা।

৩৩ বছর বয়সী শিক্ষিকা আমিনেহ নাদেমি ধ্বংসস্তূপের ভেতর দাঁড়িয়ে এখনও স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন, কোথায় ছিল মেয়েদের শ্রেণিকক্ষ, কোথায় ছেলেদের ক্লাস, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ কিংবা নামাজের ঘর। যে শ্রেণিকক্ষে তিনি প্রথম শ্রেণির শিশুদের পড়াতেন, সেখানে এখন পড়ে আছে শুধু ভাঙা কংক্রিট আর ধ্বংসাবশেষ।

আমিনেহ জানান, সেদিন রমজান মাস হওয়ায় শিশুরা প্রথমে নামাজ কক্ষে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করছিল। এরপর তিনি প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ফার্সি বর্ণমালার নতুন একটি অক্ষর শেখানো শুরু করেন। ঠিক সেই সময় ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের প্রথম হামলার খবর আসতে শুরু করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার জন্য ফোন করা শুরু হয়।

ছবিঃ বিবিসি

তিনি বলেন, তার ১৫ জন ছাত্রীর মধ্যে তখন মাত্র পাঁচজন শ্রেণিকক্ষে ছিল। করিডোরে থাকা অবস্থায় দূরে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তিনি দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফিরে যান। ঠিক বের হওয়ার মুহূর্তেই একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিদ্যালয়ে আঘাত হানে।

আমিনেহর ভাষায়, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ও শিশুরা ছিটকে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো কক্ষ ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। তিনি বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখা শিশুদেরও দেখতে পাচ্ছিলেন না। এরপর আরেকটি বিস্ফোরণ, শিশুদের কান্না, মানুষের আর্তনাদ এবং পুরো ভবন ধসে পড়ার দৃশ্য তার চোখের সামনে ঘটে। ধোঁয়া কিছুটা সরে গেলে তিনি আহত শিশুদের নিচে থাকা লোকজনের কাছে পৌঁছে দেন এবং আগুন ও ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তখনও তিনি বুঝতে পারেননি, অধিকাংশ শিশু ভবনের নিচে চাপা পড়ে গেছে।

মিনাব প্রসিকিউটর অফিস জানিয়েছে, হামলায় ১২০ শিশুসহ মোট ১৫৬ জন নিহত হন। ঘটনাটি যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক প্রাণহানির একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্ধারকর্মী রেজা বাশারাতি জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় পুরো এলাকা সন্তানের খোঁজে ছুটে আসা পরিবারের ভিড়ে পরিপূর্ণ ছিল। উদ্ধারকাজ শুরুর পর তারা কাউকেই জীবিত পাননি। নিহতদের অনেকের দেহ এতটাই ছিন্নভিন্ন ছিল যে অনেক পরিবার শুধু জুতা কিংবা পোশাক দেখে সন্তানকে শনাক্ত করতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, তার এক আত্মীয়া বারবার অনুরোধ করছিলেন তার ছেলেকে খুঁজে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি জানতেন শিশুটি আর বেঁচে নেই। সেই ভয়াবহ দৃশ্য এখনও তাকে তাড়া করে ফেরে এবং কয়েক দিন তিনি ঘুমাতে পারেননি।

হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে কোনো প্রমাণ ছাড়াই এর জন্য ইরানকে দায়ী করেন। পরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় না এবং ঘটনার তদন্ত চলছে।

তবে মার্কিন কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক তদন্তের প্রাথমিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের কারণে বিদ্যালয়টিকে ভুলবশত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সামরিক স্থাপনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার দায় স্বীকার করেনি।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকেই বিদ্যালয়টি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মূল কমপাউন্ড থেকে আলাদা দেয়াল দিয়ে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং এর নিজস্ব প্রবেশপথ ও খেলার মাঠ ছিল। হামলার আগেই বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, তদন্ত এখনও চলমান থাকায় এ বিষয়ে নতুন কোনো মন্তব্য করা হবে না।

১২০ শিশুর মৃত্যুতে স্তব্ধ মিনাব।ছবিঃ বিবিসি

বিদ্যালয় থেকে অল্প দূরের কবরস্থানে এখন পাশাপাশি শায়িত বহু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে জড়ো হন নিহতদের স্বজনরা। নয় বছর বয়সী শিক্ষার্থী সেতায়েশের মা মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি প্রতিদিন মেয়ের কবরের পাশে গিয়ে বসেন।

১২০ শিশুর মৃত্যুতে স্তব্ধ মিনাবছবিঃ বিবিসি

তিনি বলেন, হামলার পর স্কুলে গিয়ে দেখেন সেখানে আর কোনো ভবন নেই। চারদিকে শুধু ধোঁয়া, শিশুদের চুল, ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ। তিনি বারবার মেয়েকে ডাকছিলেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। পরদিন ভোরে তাকে জানানো হয়, সেতায়েশ আর বেঁচে নেই। মেয়েটিকে শেষ পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল তার পরা ক্রিম রঙের মোজা দেখে।

মাসুমেহ জানান, সেতায়েশের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে শিক্ষক হওয়ার। বাসায় পুতুলগুলোকে সারি করে বসিয়ে সে নিজেই শিক্ষক সেজে পড়াত।

ইরান সরকার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে মিনাবের এই হামলার ঘটনা তুলে ধরছে। এমনকি নিহতদের স্মরণে আলোচকদের বহনকারী একটি বিমানের নামও রাখা হয়েছে “মিনাব-১৬৮”।

যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও মিনাবের এই ট্র্যাজেডি ইরানের ভেতর ও বাইরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ঘটনা তথাকথিত নির্ভুল সামরিক হামলার দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

আজও আমিনেহ নাদেমি তার সাবেক শিক্ষার্থীদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের স্মরণ করেন। আর সেতায়েশের মা মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “এই শিশুদের অপরাধ কী ছিল? তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। ছিল শুধু একটি পেন্সিল, একটি বই, একটি খাতা আর একটি স্কুলব্যাগ। তারা শুধু পড়তে গিয়েছিল।”

সুত্রঃ বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চুক্তি

শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার এবং বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সহযোগিতা আরও গভীর করতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই…

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের অবস্থান শক্ত হচ্ছে, তারেক রহমান আগুন নিয়ে খেলছেন: সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার

বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের  সাবেক হাইকমিশনার ভীণা সিক্রি। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশ…

টানা তিন শিরোপার পর কোচিং ছাড়ার ভাবনা ফাগানের

অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল লিগ (এএফএল) ক্লাব ব্রিসবেন লায়ন্সকে টানা তৃতীয়বার প্রিমিয়ারশিপ জেতানোর পর ২০২৭ সালে কোচ হিসেবে থাকবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন ক্রিস ফাগান।…

পাকিস্তানে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে বোমা হামলা, নিহত ১১

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পুলিশের একটি তল্লাশি চৌকিতে বোমা হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২০ জন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর)…

একদিনে মা-মেয়েসহ সড়কে ঝরল চার প্রাণ, আহত ৩০

দেশের তিন জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় মা-মেয়েসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) মানিকগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লায় এসব…

জাসদ কার্যালয়ে গোপন বৈঠকের অভিযোগ, আ. লীগ সন্দেহে অর্ধশতাধিক আটক

রাজধানীর গুলিস্তানের জিপিও মোড়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয়ে কথিত গোপন বৈঠক এবং সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবস্থানের অভিযোগে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au