বাংলাদেশ

সরদার সেলিম রেজার কলাম

শোক যখন উৎসবে পরিণত হয়, তখন ইতিহাসও ক্লান্ত হয়ে পড়ে

  • 12:14 pm - August 01, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩১৩ বার
৫১ বছর আগে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘাতকদের বুলেটে রক্তাক্ত হয়েছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের প্রায় সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ছবি: পাবলিক ডোমেইন থেকে সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ০১আগস্ট: আজ ১ আগস্ট। শোকের মাসের শুরু । ৫০ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘাতকদের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ তাঁর পরিবারের প্রায় সবাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

এই হত্যাকাণ্ড কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির হৃদয়ে ছুরি চালানো। তাই আগস্ট মাস বাঙালির জন্য মানেই বেদনার মাস, আত্মজিজ্ঞাসার মাস।

কিন্তু ৫০ বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতেই হয়: আমরা কি সত্যিই শোক পালন করছি, নাকি অজান্তেই শোককে উদযাপনের বস্তু বানিয়ে ফেলেছি?

প্রতীক থেকে প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতা

রাজনীতিতে প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর ছবি, ৭ মার্চের ভাষণ, কালো ব্যাজ—এগুলো প্রতীক। কিন্তু প্রতীকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার অন্তর্নিহিত দর্শন।

একটি দল যখন নিজের ইতিহাসকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে ঢেকে রাখে, তখন ইতিহাস ধীরে ধীরে আবেগ হারায়। আর আবেগ হারালে মানুষের হৃদয় থেকে আনুগত্যও সরে যায়।

আমার মতে, আওয়ামী লীগের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল এই জায়গায়। যে শোক আদর্শের পুনর্জাগরণ ঘটানোর কথা ছিল, যে শোক থেকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর “সোনার বাংলা”র স্বপ্ন বুনে দেওয়ার কথা ছিল, তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে।

আগস্ট মাস যেন আর আত্মসমালোচনার মাস থাকল না। হয়ে গেল কর্মসূচির ক্যালেন্ডার পূরণের মাস।

তৃণমূল থেকে দূরে সরে যাওয়া

এর পেছনে সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতাও কম দায়ী নয়। দীর্ঘদিন ধরে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে তৃণমূলের অনুভূতির চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে ফাইলভিত্তিক কর্মসূচি।

একসময় ১৫ আগস্ট ছিল নিভৃত বেদনার দিন। গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র মানুষ নিজ উদ্যোগে জাতির পিতাকে স্মরণ করত। কাঙালি ভোজ ছিল প্রতীকী। দরিদ্র মানুষের সঙ্গে অন্ন ভাগাভাগির মাধ্যমে শোককে মানবিক দায়বদ্ধতায় রূপ দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। ৭ মার্চের ভাষণ উচ্চারিত হতো নতুন করে আদর্শের শপথ হিসেবে। সেখানে ক্যামেরার চেয়ে মানুষের উপস্থিতি ছিল বড়।

কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সংস্কৃতি নব্বই দশক থেকে বদলে গেল।
গণচাঁদা ও মানুষের অংশগ্রহণভিত্তিক কাঙালি ভোজের জায়গায় এল কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ করা বিরিয়ানির প্যাকেট। অনেক ক্ষেত্রে সেই প্যাকেটেও স্থান পেল নেতাদের ছবি।
শোকের ভাষা হয়ে উঠল প্রচারণার ভাষা।
মানুষের অংশগ্রহণের জায়গায় এল দর্শকসুলভ উপস্থিতি।

ফলাফলও স্পষ্ট—আবেগ ক্ষয় হলো, সম্পৃক্ততা কমল, আর শোকের সামাজিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ল।

বাজেট আর ব্যানারের রাজনীতি

অনেক কর্মসূচি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন মূল উদ্দেশ্য মানুষের অংশগ্রহণ নয়, বরং বাজেট বাস্তবায়ন। আয়োজন যত বড়, ব্যয় তত বেশি; ব্যয় যত বেশি, নানা স্বার্থের সুযোগও তত বিস্তৃত—এমন সমালোচনা দলের ভেতর ও বাইরে বহুবার উচ্চারিত হয়েছে।

চাঁদাবাজি করে কাঙালি ভোজ? শোক দিবসে রান্না-বান্নার উৎসব? যে মানুষটি সারাজীবন বলেছেন “চুরি করব না, চুরি করতে দিব না”, অথচ তাঁরই নামে চাঁদা তুলে ভোজ করা কতটা যুক্তিক?

সারাদেশের আনাচে কানাচে ফেস্টুন, ব্যানার, পোস্টার। ফেসবুকে নিজের ছবির সাথে নেতার ছবি জোড়া দিয়ে “শোকাবহ আগস্ট” পোস্ট। সমাধিতে গিয়ে সেলফি।
এগুলো কি শোক, নাকি প্রদর্শনী?

শোকের শক্তি কোথায়?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো রাজনৈতিক দল কেবল স্মৃতিচারণ দিয়ে টিকে থাকে না। টিকে থাকে তখনই, যখন স্মৃতিকে আদর্শে, আদর্শকে সংগঠনে এবং সংগঠনকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

শোকের প্রকৃত শক্তি মঞ্চের ব্যানারে নয়; মানুষের হৃদয়ে।
সেই হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগ হারালে শত ব্যানার, হাজার পোস্টার কিংবা লাখো টাকার কর্মসূচিও রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।

১৫ আগস্ট কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির ইতিহাসের এক গভীর ক্ষতের নাম। সেই ক্ষতকে যদি আমরা কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজনে সীমাবদ্ধ করি, তবে শোক আর শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না; বরং ধীরে ধীরে উৎসবে পরিণত হয়। আর যখন শোক উৎসবে পরিণত হয়, তখন ইতিহাসের শিক্ষা হারিয়ে যায়, থাকে শুধু অনুষ্ঠান।

তাহলে উপায় কী?

বিগত এক যুগ ধরে বলে আসছি। নীতিনির্ধারকেরা গুরুত্ব দেননি। এখন সময় এসেছে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

১. সেলফি ও প্রচার বন্ধ করুন: শোকের দিনে মসজিদে মসজিদে দোয়া, মন্দিরে প্রার্থনা। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের আত্মার শান্তির জন্য। ক্যামেরা নয়, মোনাজাত হোক।

২. মানুষের পাশে দাঁড়ান: ব্যানারের টাকা দিয়ে একটি এতিমের স্কুলের খরচ দিন। কর্মী-সমর্থকের বিপদে পাশে দাঁড়ান। এটাই বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ছিল।

৩. আদর্শ চর্চা করুন: দুর্নীতি, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কাজ করুন। শুধু ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে মনে করলে হবে না, ৩৬৫ দিন তার আদর্শ ধারণ করতে হবে।

 

আপনি একমত হোন বা দ্বিমত—এই আত্মসমালোচনাটা আজও প্রয়োজন।

শোককে আমরা কোথায় হারিয়ে ফেললাম? সম্ভবত হারিয়ে ফেলেছি প্রদর্শনীর ভিড়ে, হারিয়ে ফেলেছি বাজেটের হিসেবে, হারিয়ে ফেলেছি নিজের হৃদয় থেকে।

জাতির পিতা চেয়েছিলেন একটি মানবিক বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশ গড়ার কাজে হাত লাগান। মানুষকে ভালোবাসুন। সেটাই হবে সবচেয়ে বড় শোক পালন।

শোক হোক অন্তরের, উৎসবের নয়।
শ্রদ্ধা হোক কাজের, ব্যানারের নয়।

মতামত: সরদার সেলিম রেজা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি ও পরিবেশ কর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র

এই শাখার আরও খবর

মেসির বিদায়ে নেইমারের আবেগঘন বার্তা

লিওনেল মেসির সঙ্গে নেইমার জুনিয়রের সম্পর্কটা শুধু মাঠের সতীর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের বন্ধুত্বও ফুটবলবিশ্বে বেশ আলোচিত। বার্সেলোনায় একসঙ্গে খেলার সময় গড়ে উঠেছিল তাদের দারুণ…

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল দেশ, কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি

ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষক, অভিভাবক ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের…

আর্জেন্টিনার জয়, গোল-অ্যাসিস্টে বিদায় রাঙালেন মেসি

জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচটাও স্মরণীয় করে রাখলেন লিওনেল মেসি। বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে জয় দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় শেষ করেছে…

অভিবাসন কমানোর পরিকল্পনায় প্রবীণসেবা কর্মীরাও ঝুঁকিতে

অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী জোটের প্রস্তাবিত অভিবাসন কমানোর পরিকল্পনায় দেশটির প্রবীণসেবা খাতে কর্মরত কিছু কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে স্বীকার করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর। একই সঙ্গে…

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন কমাতে তিন দলের তিন পরিকল্পনা

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতি নিয়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি, বিরোধী লিবারেল-ন্যাশনাল জোট এবং ওয়ান নেশন পার্টির মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। তিন দলই বর্তমানের তুলনায় অভিবাসন…

ভেনিস বিয়েনালে মেন্টরশিপে বাংলাদেশি শিল্পী মিতা চৌধুরী

অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেনিস বিয়েনালে মেন্টরশিপ কর্মসূচির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আন্তঃবিষয়ক শিল্পী মিতা চৌধুরী। ২০২৬ সালের এই বিশেষ মেন্টরশিপের জন্য তাকে নির্বাচিত করেছে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au