বিশ্ব

‘মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য বেঁচে গেছি’, ৯০০ শিক্ষার্থীকে বাঁচিয়ে নেপালে নায়ক স্কুলপ্রধান

  • 10:34 pm - August 31, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৯৫ বার
রাজেন্দ্র দাওয়াদির হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল। তিনি যে সতর্কবার্তা শুনছিলেন, সেটি সত্যিই বড় কোনো বিপদের ইঙ্গিত কি না, তা তাঁকে দ্রুত বুঝতে হয়েছিল। দ্রুত বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাঁকে এখন নায়ক হিসেবে প্রশংসা করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল রাজেন্দ্র দাওয়াদিকে। তিনি যে সতর্কবার্তা শুনছিলেন, সেটি সত্যিই বড় বিপদের ইঙ্গিত কি না, তা বোঝার সময়ও ছিল না তাঁর হাতে।

ভুল সিদ্ধান্ত নিলে ৯০০ শিক্ষার্থীর একটি দিনের ক্লাস নষ্ট হতো। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারত।

শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই সব শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে বের করে উঁচু জায়গায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন নেপালের ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। শিক্ষার্থীরা দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় ওঠার কয়েক মিনিট পরই পাহাড় থেকে নেমে আসে পানি, পাথর ও কাদার ভয়ংকর স্রোত। মুহূর্তেই তা শহরটিকে গ্রাস করে এবং স্কুলটি চিরতরে মাটির নিচে চাপা পড়ে।

দাওয়াদি জানান, শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার সময় নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা একটি ছাত্রাবাস ভবনকে চোখের সামনে পানির স্রোতের নিচে হারিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। স্কুলের পেছনের সরু পথ ধরে শিক্ষার্থীরা উঁচু জায়গায় ওঠার চেষ্টা করছিল। নিচে তখন পানির সঙ্গে পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল।

কেউ কেউ মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রাণে বেঁচেছে। ৯০০ শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচানোর এই সিদ্ধান্তের জন্য দাওয়াদিকে এখন জাতীয় বীর হিসেবে প্রশংসা করা হচ্ছে।

‘মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য বেঁচেছি’

প্রথমে সতর্কবার্তার ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি অনেক শিক্ষার্থী। একজন সতর্কবার্তা শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কেউ কেউ আবার গণিতের ক্লাসে থাকা বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইউনিশা আমাত্য বলেন, নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাতে তাঁদের হাতে প্রায় কোনো সময়ই ছিল না।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার বন্ধুরা মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য বেঁচে গেছি।’

দ্রুত হাঁটতে না পারায় বন্ধুরা তাঁকে উঁচু জায়গায় উঠতে সাহায্য করেছিল। স্কুলের পেছনের সরু সিঁড়ি দিয়ে তাঁরা পাহাড়ের দিকে ওঠেন। এরপর চোখের সামনেই ত্রিশূলী বাজার পানির স্রোতে ভেসে যেতে দেখেন ইউনিশা।

ঘটনার আগে। ফাইল ছবি

এবং এরপর। ফাইল ছবি

নেপালের ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ঝুঁকি নিয়ে ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে বের হয়ে উঁচু ও নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। শিক্ষার্থীরা দৌড়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর কয়েক মিনিট পরই পানি, পাথর ও কাদার ভয়াবহ স্রোত শহরের ওপর দিয়ে ধেয়ে যায় এবং স্কুলটিকে চিরতরে মাটির নিচে চাপা দিয়ে দেয়। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, উঁচু জায়গায় ওঠার পথে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। জুতা পিছলে গেলে নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল তাঁর।

তবে ইউনিশা ভাগ্যবান ছিলেন। অন্য একটি পথ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করা অনেক মানুষ ও শিক্ষার্থী স্রোতে ভেসে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাবা ভেবেছিলেন মেয়ে মারা গেছে

স্কুল থেকে বের হওয়ার পর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা প্রথমে কয়েক শ মিটার দূরের একটি উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেন। পরে পাশের একটি গ্রামে চলে যান। সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অনেকেই সেখানে আটকা পড়েন।

দাওয়াদি ও ইউনিশা দুজনের বাড়িই স্কুলের নদীর ওপারে। পরে জরুরি উদ্ধার তৎপরতার অংশ হিসেবে হেলিকপ্টারে তাঁদের বাড়িতে নেওয়া হয়।

ইউনিশার বাবা যুবরাজ আমাত্য প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ভেবেছিলেন তাঁর মেয়ে মারা গেছে।

স্কুটারে করে তিনি স্কুলের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, ত্রিশূলী বাজার ইতিমধ্যেই পানির স্রোতে তলিয়ে গেছে। তিনি বারবার মেয়ের ফোনে কল করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের ওপর থেকে ইউনিশা ফোন ধরেন। তবে বাবা-মেয়ের দেখা হয় তিন দিন পর।

ইউনিশা বেঁচে গেলেও তাঁর পরিচিত স্কুলটি আর নেই। দুর্যোগের আগে ও পরে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, স্কুলের ভবনগুলো প্রায় পুরোপুরি কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে গেছে।

অন্য অনেক বাড়িঘর ও প্রতিষ্ঠানের মতো এই স্কুলকেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন করে দাঁড় করাতে দীর্ঘ সময় এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।

নিহত অন্তত ৯১৯, নিখোঁজ ৪ হাজার ৭৯৩

নেপালের নুয়াকোট জেলার দেবঘাটে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর কাদায় ডুবে থাকা ভবন ও সড়কের দিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ছবি: প্রকাশ মাথেমা/এএফপি

নেপাল ও চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বতে এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৭৯৩ জন।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি জানিয়েছে, সোমবার সকাল পর্যন্ত দেশটিতে ৯০৩টি মরদেহ বা মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। তিব্বতে আরও ১৬ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার পর বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলো থেকে নতুন তথ্য আসতে শুরু করায় নেপালের মৃতের সংখ্যা একবারে ১১৫ জন বেড়েছে।

দুর্যোগে ভেসে যাওয়া অনেক মরদেহ নদীর স্রোতে বহুদূর চলে গেছে। ফলে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। নদীর অনেক নিচের দিকে কয়েক শ কিলোমিটার দূর থেকেও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন দেহাবশেষ রাখা হয়েছে ২১টি হাসপাতালে। চিতওয়ানে মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ফরেনসিক দলকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেখানে কিছু মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক, ৮৩ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বিধ্বস্ত নদীব্যবস্থার পাশে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ৯৩৩ জন রয়েছেন।উদ্ধার

নেপালের নুয়াকোটে ভুটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে।
ছবি: আম্বির তোলাং/নূরফটো/গেটি ইমেজেস

তৎপরতায় ২০ হাজার ৮০০-এর বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেলগুলোতে আটকে পড়াদের উদ্ধারে বিদেশি দলও কাজ করছে।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত বলেন, পাহাড়, বসতি ও নদী এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করে উদ্ধারে কাজ চলছে।

নেপাল জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতুর কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত হেলিকপ্টার ফ্লাইটে জীবিতদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

হিমালয়ে শুরু, প্রায় ১০০ কিলোমিটারজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ

গত ২৬ আগস্ট হিমালয়ের উঁচু এলাকায় এই দুর্যোগের সূত্রপাত। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে লাংটাং ন্যাশনাল পার্কের কাছে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে।

এর ফলে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান ছিল। এরপর বরফ, পাথর, পানি ও কাদার ভয়ংকর স্রোত লেনদে ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে পাহাড়ের যে অংশটি ধসে পড়েছিল, সেটি হিমবাহ ধসে নেমেছিল নাকি ভূমিধসের সঙ্গে হিমবাহের একটি অংশ পাহাড় থেকে নেমে এসেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময়ও একই এলাকায় বড় ধরনের ধস নেমেছিল। সে সময় লাখ লাখ ঘনমিটার বরফ ও পাথর একটি গ্রামকে চাপা দিয়েছিল এবং ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

সূত্র-নিউজ.কম.এইউ

এই শাখার আরও খবর

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au