এশিয়াজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, চাপে সাধারণ মানুষ। ছবিঃ সংগৃহীত
এশিয়ার অধিকাংশ তেল আমদানিনির্ভর দেশ চলতি বছরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের সরকারকে জ্বালানি মূল্যের চাপ সামাল দিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কোথাও সরাসরি দাম বাড়ানো হয়েছে, আবার কোথাও ভর্তুকি ও বিশেষ সহায়তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। এরপর পাঁচ মাসের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর আবারও ২০ টাকা বাড়িয়ে ডিজেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ টাকা। দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহৃত ডিজেলই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মোট জ্বালানি বিক্রির প্রায় ৬৫ শতাংশ।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জ্বালানির দাম বাড়ানোর পেছনে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি পাচার ঠেকানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কারণ কিছু প্রতিবেশী দেশে জ্বালানির দাম বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় সীমান্ত এলাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে দীর্ঘ সময় জ্বালানির দাম স্থির রাখলেও সরকারের প্রকৃত আর্থিক চাপ কমে না। বরং জ্বালানি খাতে লোকসান মেটাতে সরকারের ঋণ বাড়তে পারে এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধেও বিলম্ব হতে পারে। ফলে পাম্পে দাম না বাড়িয়ে লোকসান বহন করার অর্থ হলো সরকারের আর্থিক বোঝা অন্যভাবে জমতে থাকা, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। এ অবস্থায় মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানির দাম কীভাবে সমন্বয় করা হবে এবং যেসব মানুষ বাড়তি ব্যয় বহন করতে পারেন না, তাদের জন্য কী ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি দেখা যায়। পাকিস্তান নিয়মিত জ্বালানি তেলের দাম প্রকাশ করছে। দেশটিতে ১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ৩৭১ রুপি থেকে বেড়ে ১৮ সেপ্টেম্বর প্রায় ৪২৫ রুপিতে পৌঁছায়। তবে মোটরসাইকেল, রিকশা ও ছোট গাড়ির ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতি লিটারে ১০০ রুপি পর্যন্ত পেট্রোল সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালের ভয়াবহ জ্বালানি সংকট ও দীর্ঘ লাইনের অভিজ্ঞতার পর তুলনামূলক নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। সেখানে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত অটোমোটিভ ডিজেলের দাম ধীরে ধীরে বাড়লেও জুনের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও তা কমানো হয়। পাশাপাশি পরিবহন ও মৎস্য খাত এবং নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা রাখা হয়েছে।
ভারত শুরুতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ এড়াতে আবগারি শুল্ক কমিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম স্থির রাখে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও খুচরা মূল্য স্থির থাকায় একপর্যায়ে ভারতের রাষ্ট্রীয় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনিক লোকসান আনুমানিক ২ হাজার ৪০০ কোটি রুপিতে পৌঁছায়। পরে রাজ্য নির্বাচন শেষ হওয়ার পর জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও একই ধরনের ভিন্ন নীতি দেখা গেছে। ফিলিপাইন বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির দাম পরিবর্তন করেছে এবং একই সঙ্গে চালক ও পরিবহন খাতের কর্মীদের সহায়তা দিয়েছে। মালয়েশিয়া ডিজেলের দাম বাড়ালেও সাধারণ নাগরিকদের জন্য পেট্রোলে ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে।
ইন্দোনেশিয়াতেও জ্বালানি ভর্তুকি ধরে রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর সরকারের নীতিতে তুলনামূলক বেশি দামের জ্বালানিকে বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ব্যবহৃত জ্বালানির দাম সহনীয় রাখতে সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কখন দাম বাড়ানো হচ্ছে, কীভাবে মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং বাড়তি ব্যয়ের চাপ কার ওপর পড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমালোচনার অন্যতম জায়গা হলো মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকা।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তায় বাংলাদেশ একটি নিয়মভিত্তিক জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন দাম অপরিবর্তিত রেখে পরে একবারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন কমানো। তবে এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বরের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সেই নিয়মভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে সরকারের সিদ্ধান্তনির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহারের সমালোচনা করা হয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ব্র্যাক ইপিএলের হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে দেশের ডিজেলের দামের ব্যবধান লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সেখানে ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হলেও সরকারের লোকসানের পুরো ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। ফলে একদিকে সাধারণ মানুষকে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক চাপও পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার মতো কিছু দেশ নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশেও কৃষকদের জন্য প্রস্তাবিত কৃষক কার্ডের মাধ্যমে একই ধরনের সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এপ্রিল মাসে ২২ হাজার কৃষককে লক্ষ্য করে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তার একটি প্রাক-পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পরে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৩৬৪ কৃষককে নিয়ে বড় পরিসরে পাইলট কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে এর উদ্বোধন হয়নি এবং এখন পর্যন্ত নতুন তারিখও ঘোষণা করা হয়নি।
ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে বিশেষ করে সেচ মৌসুমে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তাই ডিসেম্বর মাসে বোরো মৌসুমের সেচ কার্যক্রম শুরুর আগেই কৃষক কার্ডের আওতা বাড়ানো এবং ডিজেলের বাড়তি দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেচ সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও রয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম একবারে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে একবারে সবচেয়ে বড় জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি। সে সময় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। মূল্যবৃদ্ধির এক সপ্তাহের মধ্যেই ২৬টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে ২৫টির দাম বেড়ে যায়। কোনো কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধির হার ছিল ১৪ শতাংশ পর্যন্ত।
এর পরের মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি এক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে ছিল। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আবার প্রায় ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। জ্বালানি সংকট ও বাড়তি ব্যয়কে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ অবস্থায় জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি পুনর্বহাল, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
সুত্রঃ The Daily Star