জনাব আরিফুল হক আমার সবচেয়ে প্রিয় অভিনেতাদের একজন। আমার নিজের বিবেচনায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অমন শক্তিশালী অভিনেতা খুব বেশী আসেননি। কী ভিলেন, কী নবীন ব্যক্তি, অধরা প্রধান চরিত্র, সবক্ষেত্রেই আরিফুল হক ছিলেন দূর্দান্ত। আমার মনে আছে, ছোট বেলায় কোন একটি নাটকে আরিফুল হক আছেন জানলে সেটি “মাষ্ট সি” ক্যাটাগরিতে রাখতাম আমি।
ঘটনাক্রমে তাঁর ছেলে স্কুলে আমার বছর দুয়েকের জুনিয়র ছিলো; এই বয়সে ভাবতাম, সে কত ভাগ্যবান যে, প্রতিদিন আরিফুল হকের সাথে কথা বলে, তাঁর সাথে গল্প করে, যেখানে আমরা তাঁকে শুধু টিভিতে দেখি। তিনি শুধু আমার নয়, আমাদের পুরো পরিবারের কাছেই প্রিয়তম চরিত্রাভিনেতাদের একজন ছিলেন। আমার পিতা মনে করতেন, বাংলাদেশ আরিফুল হকের প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পারেনি। আরিফুল হক শুধু অভিনয় নয়, গানের ক্ষেত্রেও ছিলেন খুবই উঁচু মাপের শিল্পী। তাঁকে দেখলেই মনে হতো, আপাদমস্তক একজন শিল্পী; আর এখন? সেটি না হয় আমার লেখাতেই প্রকাশিত হোক।
জনাব আরিফুল হকের দুটো লেখা আমার চোখে পড়লো। বেশ ক’বছর আগে আমার এক বন্ধুর সাথে আলোচনায় আমি যখন আরিফুল হকের অভিনয়শৈলী এবং চরিত্র ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা নিয়ে কথা বলেছিলাম তখন সেই বন্ধু হকের গুন নিয়ে আমার সাথে একমত হয়ে জানালেন যে, হক খুবই সাম্প্রদায়িক একজন মানুষ। প্রমান হিসেবে সে অনেক কথাই বলেছিলো; আমি তেমন মনোযোগ দিয়ে শুনিনি।
তবে অনেকেই আমাকে এই একই কথা বলেছিলেন পরবর্তীতে। তো এতদিন পর হকের দুখানা লেখা আমার চোখে পড়লো এঁদের দাবী পরীক্ষা করার জন্য। আমি আগ্রহ নিয়ে পড়ে ফেললাম, এবং মনে হলো, এই মানুষটিই কি আমার প্রাক- যৌবনের সেই প্রিয় অভিনেতা? আমি অবাক হয়ে তাঁর ছবিটি দেখলাম; তিনিইতো। আমি আমার সেই নষ্টালজিয়ায় ফিরে গেলাম।
মনে হলো, বাংলার হিন্দু- মুসলিম সবার প্রিয় অভিনেতা আজ যেন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হয়ে কথা বলছেন। আমি সরাসরিই তাঁকে এই অভিধায় অভিযুক্ত করবো; অবশ্য তাঁর লেখা পড়ে অন্ততঃ আমার মনে হয়নি তিনি আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের তাঁকে এমন মনে করাতে খুব আপত্তি করবেন। আজ তাঁর দুটো লেখার একটি বিশ্লেষন দেবো; কারন, এটি প্রয়োজনীয়, এবং এটি না করলে অনেক মানুষই তাঁর অনৈতিহাসিক বক্তব্যকে “ঐতিহাসিক” মনে করবে।
আরিফুল হকের দুটি লেখা, ‘সাংস্কৃতিক ভিক্ষুকতা!’ এবং ‘বাংলাদেশি ভাবনা ও একটা সত্য ঘটনা’, আপাতদৃষ্টিতে দুটি আলাদা বিষয়ে। প্রথমটিতে তিনি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে স্মরণ করা এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দ্বিতীয়টিতে হিন্দু পাঠকদের উদ্দেশে একটি গ্রামের কথিত অভিজ্ঞতা দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতপাতের পরিস্থিতি তুলনা করেছেন। কিন্তু লেখাদুটির যুক্তি এক জায়গায় এসে মেলে। ইতিহাসের জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতকে তিনি বারবার ধর্মীয় পরিচয়ে ভাগ করেন। যে তথ্য তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে মেলে, সেটি রাখেন; যে তথ্য ছবিটিকে জটিল করে, সেটি সরিয়ে দেন।
তাঁর বক্তব্য সমালোচনা করার অর্থ পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকের বঞ্চনা, ভারতের জাতপাতের নিপীড়ন বা উপেক্ষিত মুসলিম সংগ্রামীদের অবদান অস্বীকার করা নয়। বরং এসব বিষয় এত গুরুত্বপূর্ণ যে সেগুলোকে যাচাইহীন সংখ্যা, অপ্রমাণিত উদ্দেশ্য এবং সাম্প্রদায়িক সাধারণীকরণের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
প্রথম অংশ: ‘সাংস্কৃতিক ভিক্ষুকতা’ এবং ইতিহাস থেকে মানুষ বাদ দেওয়ার চেষ্টা
আরিফুল হক শুরু করেন এই প্রশ্নে, “আমরা কি ভিক্ষুকের জাতি হয়ে গেলাম?” তাঁর পরের অভিযোগগুলো আরও ব্যাপক: “জাতিসত্বা ধার করা। জাতীয় সংগীত ধার করা। জাতীয় শ্লোগান ধার করা। উৎসব অনুষ্ঠান ধার করা।” যেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রায় সবটাই অন্যের দান। এ প র্যন্ত পড়েই আমি থমকে যাই। ভাবি, এই মানুষটি বাংলা চলচ্চিত্রের একজন বিখ্যাত অভিনয় “শিল্পী”? এটি আমার জন্য কষ্টের; তবুও একটু বিবরণ দেয়া যাক।
এখানে প্রথম প্রশ্ন, ‘ধার করা’ বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেন? আজকের ভারত ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রসীমা প্রতিষ্ঠার আগে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত এবং লোকজ জীবন গড়ে উঠেছে। সেই ইতিহাসে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধসহ বহু মানুষের সৃষ্টি ও আদানপ্রদান আছে। বর্তমান সীমান্তের ওপারে জন্ম নেওয়া কোনো বাঙালির সাহিত্য বাংলাদেশের মানুষ পড়লে তা ভিক্ষা হয় না। বাঙালি মুসলমানও বাংলা ভাষা ও এই ভূখণ্ডের লোকঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। বাংলার সত্যপীর বিষয়ক ঐতিহ্যেও বিভিন্ন ধর্মীয় লোকধারণার মেলবন্ধনের ইতিহাস পাওয়া যায়। বাঙ্গালী মুসলমান কেবলই “মুসলমান” নন। তাঁর কাছে একটি ছোট্ট প্রশ্নঃ ১২০৬ খ্রীষ্টাব্দের আগে এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষেরা কি সবাই মুসলমান ছিলেন?
আরিফুল হকের নিজের অভিনয়জীবনই তাঁর দাবির সামনে একটি প্রশ্ন রাখে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে বাংলাদেশে নির্মিত দেবদাস চলচ্চিত্রে তিনি দেবদাসের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সেই বাংলা সাহিত্য নিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং তাতে তাঁর অভিনয়কে আমরা বাংলাদেশের শিল্পচর্চার অংশ হিসেবেই দেখি।
তাহলে শরৎচন্দ্রের কাহিনী অভিনয়ের উপাদান হতে পারে, অথচ বাংলা অঞ্চলের আরেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব প্রীতিলতাকে নিয়ে ছবি নির্মাণ করলেই তা ‘সাংস্কৃতিক ভিক্ষুকতা’ হয় কীভাবে? কিংবা ধরুন, “সারেং বৌ” ছবিতে তাঁর সেই শক্তিশালী অভিনয়; এটির মূল কাহিনী এসেছে শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস থেকে; যাঁরা শহীদুল্লাহ কায়সারের জীবনী জানেন, তাঁরা এটিও মানবেন যে, কায়সার আরিফুল হকের বিবেচনায় “সাংস্কৃতিক ভিক্ষুক” বইতো নন; তো কায়সারের মত “সাংস্কৃতিক ভিক্ষুক” এর উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র হলে সেটিতে অভিনয় করা কি জায়েজ?
প্রীতিলতাকে নিয়ে তাঁর আপত্তি কেবল চলচ্চিত্রে ব্যয়ের প্রশ্নে থেমে নেই। তিনি লিখেছেন, “সূর্য সেন, প্রীতিলতারা যে রাজনীতি করতেন, সেটা মূলত মুসলমানদের রাষ্ট্র শাসন থেকে দূরে রাখার রাজনীতি।” আরও বলেছেন, “প্রীতিলতাদের রাজনীতির মূল কথাই তো ছিল, বঙ্গভঙ্গ রোধ।” এই দাবিটির সঙ্গে সময়রেখাই মেলে না। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ১৯১১ সালে। প্রীতিলতার নেতৃত্বে পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাবে সশস্ত্র অভিযান হয় ১৯৩২ সালে।
বঙ্গভঙ্গ রদে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের ক্ষোভ ছিল, এবং তাঁদের শিক্ষা ও ক্ষমতায় পিছিয়ে থাকার প্রশ্নও বাস্তব ছিল। কিন্তু সেই বাস্তবতা থেকে এই সিদ্ধান্ত আসে না যে দুই দশক পর প্রীতিলতার অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের অগ্রগতি ঠেকানো। এমন অভিযোগ প্রমাণ করতে তাঁর বক্তব্য বা সংগঠনের সমসাময়িক দলিল দরকার। প্রীতিলতা ও সূর্যসেনের যে সংগঠন সেটির কোন কর্মসূচীতে বা লক্ষ্যে এ জাতীয় বক্তব্য কি আছে? থাকলে এটা বলা যায় যে, এটি আরিফুল হকের লেখায় দেখানো হয়নি।
প্রীতিলতার অভিযানের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, তোলা উচিত। একটি ক্লাবে সশস্ত্র হামলার নৈতিকতা এবং তার মানবিক মূল্য ইতিহাসের আলোচনার বিষয়। কিন্তু কিছু বিপ্লবী গোষ্ঠীর অর্থসংগ্রহের বিবরণ উদ্ধৃত করে প্রীতিলতাকে “সন্ত্রাসবাদী এক ডাকাত দলের সদস্যা” ঘোষণা করা পৃথক অভিযোগ। মনে রাখতে হবে, শোষক সব সময়ই তাদের বিরুদ্ধাচারন করা মানুষদের বিকৃত সম্বোধনে ডাকে। বৃটিশদের কাছে এঁরা “ডাকাত” ছিলেন, যেমনিভাবে পাকিস্তানী হানাদারদের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন “দুর্বৃত্ত”। এটি জনাব হক জানেনা তা হতে পারেনা। তাঁর বক্তব্য পাঠ করলে মুক্তকামী মানুষদের বিরুদ্ধ্বে যাঁরা, তিনি যেন তাদেরই লোক!
আরিফুল হক মজনু শাহ, তিতুমীর, বেগম হজরত মহলসহ বহু মুসলিম সংগ্রামীর নাম তুলেছেন। তাঁদের ইতিহাস আরও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি যথার্থ। কিন্তু একজনের স্বীকৃতি দিতে আরেকজনকে মুছতে হবে কেন? বেগম হজরত মহলের বীরত্ব এবং প্রীতিলতার ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান, দুটোই আলোচনায় থাকতে পারে। ইতিহাসকে এমন তালিকা বানানো যায় না, যেখানে মুসলিম সংগ্রামীর নাম লিখতে হিন্দু সংগ্রামীর নাম কেটে দিতে হয়। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো এই বীর নারীরা যুদ্ধ করেছিলেন কি মুসলমান হওয়ায়? তাঁদের যুদ্ধ কাদের বিরুদ্ধে ছিলো? হিন্দুদের বিরুদ্ধে? নাকি বৃটিশদের বিরুদ্ধে?
এই বক্তব্যে “স্বাধীনতা” বলতে লেখক কোন স্বাধীনতাকে বোঝাচ্ছেন? ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ শাসনমুক্তি, নাকি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা, তা স্পষ্ট নয়। যাঁদের নাম তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁরা মূলত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা; তাঁরা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধা নন। আর জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নেতা হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা নন। তাই তাঁদের কৃতিত্ব স্মরণ করা যেতে পারে, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে এক করে দেখা ইতিহাসগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
১৯৭১ সালের গণহত্যা, পাকিস্তানি বাহিনীর অপরাধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলভিত্তিক ইতিহাস, এমনকি হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদনেও, অস্বীকার করার সুযোগ নেই। লেখাটির ভাষা থেকে বরং মনে হয়, লেখক ১৯৪৭-এর পাকিস্তান-প্রতিষ্ঠাকেই ‘স্বাধীনতা’ হিসেবে গ্রহণ করছেন, কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশকে যথাযথ স্বীকৃতি দিচ্ছেন না; ভারতীয় সহায়তার সমালোচনা করা যায়, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল কারণকে কেবল ভারতের ষড়যন্ত্র বা সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ বলে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের বিকৃতি; যাঁরা এই ন্যারেটিভ প্রচার করেন তাঁদের বাংলাদেশের মানুষ চেনে ভালো করেই, এইটি হক সাহেব জানেন আশা করি।
নজরুলের কণ্ঠ কি শুধু একটি অনুচ্ছেদে আটকে থাকে?
লেখার শেষে আরিফুল হক নজরুলের “পশুর মত সংখ্যাগরিষ্ঠ” হয়ে বাঁচার প্রশ্নটি তুলে মুসলিম ইতিহাসের বীরদের আদর্শ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নজরুলের বক্তব্যের একটি সত্যিকারের অংশ ব্যবহার করেছেন। সমস্যাটি হলো, নজরুলের একই অভিভাষণের অন্য কথাগুলো তাঁর আলোচনায় নেই।
১৯৩২ সালের ‘তরুণের সাধনা’ অভিভাষণে নজরুল মুসলিম তরুণদের নিজ সমাজের গোঁড়ামি, শিল্পের বিরুদ্ধে ফতোয়া এবং সংগীতচর্চায় বাধার মুখোমুখি হতে বলেন। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে শিল্পী, ভাস্কর, সংগীতজ্ঞ ও বিজ্ঞানী তৈরি হতে না দেওয়ার জন্য তিনি নিজের সমাজের গোঁড়ামিকেই দায়ী করেছেন।
একই বক্তৃতায় প্রতিবেশী হিন্দু তরুণদের ত্যাগ ও সংগঠনের প্রশংসা করেছেন। সেখানে তিনি প্রতিবেশী হিন্দু তরুণদের ঐক্য, ত্যাগ ও সাধনার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ““আমাদেরই চারিপাশে আমাদের প্রতিবেশি হিন্দু যুবকদের দেখিতেছি; কি অপূর্ব তাহাদের ঐক্য, ত্যাগ, সাধনা।” পরে সেই তরুণদের কাছ থেকে শেখার কথাও বলেন তিনি। অতএব নজরুলের মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা সত্য, প্রতিবেশী হিন্দু তরুণদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাও সত্য। একটি রেখে অন্যটি বাদ দিলে কবির বক্তব্য বদলে যায়।
আরিফুল হক নজরুলের “পশুর মত সংখ্যাগরিষ্ঠ হইয়া” বাঁচার প্রশ্নটি তুলে মুসলিম ইতিহাসের বীরদের তালিকা দিয়েছেন। কিন্তু নজরুলের ‘তরুণের সাধনা’ বক্তৃতায় ওই প্রশ্নের ঠিক আগেই রয়েছে শিল্পচর্চার পক্ষে এক কঠোর বক্তব্য। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে শিল্পী, ভাস্কর, সংগীতজ্ঞ ও বিজ্ঞানী তৈরি হতে না দেওয়ার জন্য তিনি নিজের সমাজের গোঁড়ামিকেই দায়ী করেছেন।
একই বক্তৃতায় প্রতিবেশী হিন্দু তরুণদের ত্যাগ ও সংগঠনের প্রশংসা করেছেন। আরিফুল হক যে মুসলিম ঐতিহ্যের বাক্যগুলো উদ্ধৃত করেছেন, সেগুলো নজরুল সত্যিই বলেছেন। কিন্তু এখানে নজরুলের লেখাটির খন্ডিত প্রয়োগ ঘটেছে। নজরুল বলেছেন, “আজ বাংলার মুসলিম তরুণেরা যূথভ্রষ্ট, তাই তাদের সংঘ, সাধনা ও সিদ্ধি নেই”; বিপরীতে, তিনি প্রতিবেশী হিন্দু যুবকদের “অপূর্ব ঐক্য, ত্যাগ ও সাধনা”-র জন্য বারবার প্রশংসা করেছেন। তাঁদের সংগঠনকে “এক দেহ, এক প্রাণ” এবং বিশ্বের যেকোনো যুব-আন্দোলনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন।
জাতি ও দেশের জন্য তাঁদের পিতা-মাতা, পরিবার, প্রেম, গৃহসুখ, ঐশ্বর্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ত্যাগের কথা তুলে ধরে তিনি তাঁদের “সত্যকার আজাদ, বাঁধনহারা” এবং জাতির প্রাণরক্ষাকারী “তরুণ বীর সন্ন্যাসী” হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিপরীতে মুসলিম তরুণদের চাকরিমুখী শিক্ষা ও সংকীর্ণ লক্ষ্যকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, প্রতিবেশী হিন্দু তরুণ শহীদদের আদর্শ গ্রহণ না করলে মুসলমানদের সভ্য জগতে স্থান থাকবে না। নজরুলের সেই আহ্বানকে আরিফুল হক এড়িয়ে গেছেন। নজরুল তরুণদের বলেছিলেন সৃষ্টি করতে, শিখতে এবং সংকীর্ণতা ভাঙতে।
তাঁর বক্তব্যের সেই অংশগুলো বাদ দিলে কবির কণ্ঠটি আর সম্পূর্ণ শোনা যায় না। এখানে সমালোচনার লক্ষ্য মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি নজরুলের শ্রদ্ধা নয়। লক্ষ্য হলো, সেই শ্রদ্ধার বক্তব্যকে তাঁর শিল্পমুক্তি ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাবিরোধী বক্তব্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যবহার করা। পুরো সত্য প্রকাশ না করে অর্ধসত্য বলা আসলে মিথ্যারই নামান্তর।
নজরুলের সৃষ্টিও একই কথা বলে। তিনি শ্যামাসংগীত রচনা করেছেন, আবার হিন্দু মুসলমানের ঐক্য নিয়েও গান লিখেছেন। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত সংগীতসংক্রান্ত তালিকায় তাঁর এই সৃষ্টিধারার উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রমীলা সেনগুপ্তকে বিবাহ করেছিলেন, যিনি হিন্দু, ব্রাহ্ম সমাজের পটভূমি থেকে এসেছিলেন। বিবাহ একাই কোনো কবির সমগ্র দর্শনের প্রমাণ নয়; কিন্তু তাঁর সাহিত্য, গান ও অভিভাষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে নজরুলকে কেবল একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক সীমানায় আটকে রাখা যায় না।
আরিফুল হক নজরুলকে উদ্ধৃত করে প্রশ্ন করেছেন, আমাদের গৌরব কোথায়? নজরুলের পুরো বক্তব্য পড়লে উত্তরটি আরও সমৃদ্ধ হয়। গৌরব কেবল অতীতের বীরের নাম উচ্চারণে নয়; নতুন শিল্পী, বিজ্ঞানী, সংগীতজ্ঞ তৈরি হওয়ার সুযোগে এবং অন্যের ভালো কাজ থেকে শেখার সাহসেও আছে।
একাত্তর সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ
প্রথম লেখায় আরিফুল হক আরও বলেছেন, “শিবাজীর বংশধররা ১৯৭১ সালে এদেশে ঢুকে” বাংলাদেশের জাতীয় চেতনাকে ভারতীয়করণ করে স্বাধীনতা গ্রাসের পরিকল্পনা নেয়। তাঁর পরবর্তী দাবি, স্বাধীনতার ১৫ দিনের মধ্যে ভারতের “বর্ণহিন্দু বুদ্ধিজীবীরা” বাংলাদেশের কিছু মানুষের সহায়তায় একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যা “মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ” পরিচয়ে মুসলমানদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি মুছেছে। আরিফুল হক আমাদের অপমান করেন “শিবাজীর বংশধর” বলে; আমরা যদি “শিবাজীর বংশধর হই তবে তিনিও যে তাঁরই বংশধর হয়ে যান সেটি তাঁকে বুঝতে হবে। মজার ব্যপার হলো, তিনি যতদিন অভিনয় করেছেন, উপার্জন করেছেন, ততদিন আমরা কেউই তাঁর এই অবস্থানের কথা
জানিনি; আজ তিনি এসব বলছেন কী কারনে?
ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতি বা বাংলাদেশের ওপর তার প্রভাব নিয়ে কঠোর সমালোচনা আপনি করতেই পারেন। কিন্তু এখানে একটি নির্দিষ্ট, পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক অভিযানের অভিযোগ করা হচ্ছে। সেটি প্রতিষ্ঠা করতে সংগঠনের কার্যক্রম, অর্থের উৎস এবং কথিত উদ্দেশ্যের যাচাইযোগ্য নথি প্রয়োজন। লেখক সেগুলো দেখাননি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকারের ইতিহাসকে এমনভাবে পাশ কাটানো যায় না, যেন স্বাধীনতা অন্যের হাতে সাজানো একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা ছিল।
এই বক্তব্যের সঙ্গে একাত্তরকে ধর্মীয় সন্দেহের চোখে দেখার রাজনীতির মিল নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু শুধু এই লেখা পড়ে আরিফুল হকের নিজের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নির্ধারণ করা যায় না। তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ‘রাজাকার’ বলার জন্য পৃথক প্রমাণ লাগবে। তাঁর প্রকাশিত যুক্তির সমালোচনা করার জন্য অপ্রমাণিত ব্যক্তিগত অভিযোগের প্রয়োজন নেই।
দ্বিতীয় অংশ: ‘বাংলাদেশি হিন্দু ভাইদের’ উদ্দেশে গল্প, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ কোথায়?
দ্বিতীয় লেখার শুরুতেই আরিফুল হক লিখেছেন, “বাংলাদেশী হিন্দু ভাই দের পড়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।” এরপর তিনি চলচ্চিত্রের কাজে একটি গ্রামে গিয়ে একজন হিন্দু হেডমাস্টারের বাড়িতে থাকার গল্প বলেন। সেখানে কথিত ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’র পক্ষে কিছু লোক আসেন; হেডমাস্টার তাঁদের প্রশ্ন করেন এবং বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থান সম্পর্কে বক্তব্য দেন।
গল্পের প্রথম সমস্যা যাচাইয়ের। কোন গ্রাম, কোন সাল, হেডমাস্টারের নাম কী, কথিত প্রচারপত্র কোথায়, পাঠক জানতে পারেন না। এর অর্থ ঘটনাটি ঘটেনি, এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। কিন্তু যাচাই করার সুযোগ না দিয়ে একটি ঘটনাকে জাতীয় পরিস্থিতির প্রমাণ হিসেবে হাজির করাও যায় না।
লেখাটির হেডমাস্টার বলেছেন, “বাংলাদেশে জাতপাতের বিভেদ না থাকায়” এখানকার নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মুসলমানদের সঙ্গে “সমমর্যাদা” নিয়ে বাস করেন। নিজের পেশাগত সাফল্য ও ছেলের পড়াশোনার কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মূল্যবান হতে পারে। কিন্তু একজন সম্মানিত হেডমাস্টারের জীবন থেকে বাংলাদেশের সব হিন্দু নাগরিকের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা অতিসাধারণীকরণ। তাঁরা বৈষম্য, নিরাপত্তা, জমি বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে কী বলছেন, সেটিও শুনতে হবে। তাঁদের উদ্দেশে লেখা প্রবন্ধে তাঁদের
অভিজ্ঞতাকে একটি অনামা চরিত্রের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।
ভারতের জাতপাতের নিপীড়ন নিয়ে লেখাটির উদ্বেগকে হালকা করে দেখার কারণ নেই। আম্বেদকরের আন্দোলন, সংবিধানে অস্পৃশ্যতা বিলোপের বিধান এবং পরবর্তী সুরক্ষামূলক আইনগুলোই দেখায় সমস্যাটি কত গুরুতর। আইন থাকা মানে নিপীড়ন শেষ হয়ে গেছে, এমনও নয়। কিন্তু ভারতীয় সমাজের একটি বাস্তব অন্যায় দেখিয়ে বাংলাদেশের সব সংখ্যালঘুর অবস্থাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্তোষজনক ঘোষণা করা যুক্তির একই ভুলের আরেক রূপ।
সংখ্যার নামে নিশ্চয়তা
হেডমাস্টারের বক্তব্যে বাংলাদেশের হিন্দুদের গঠন, ভারতের ব্রাহ্মণ জনগোষ্ঠী এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা নিয়ে “৯৫%”, “৩%”, “৮৫%” এর মতো সংখ্যা আছে। কোন আদমশুমারি, কোন জরিপ, কোন সাল, কোন প্রতিষ্ঠান, তা পরিষ্কার করা হয়নি। একটি দেশের জনসংখ্যায় কারও আনুমানিক অংশ কত, সেটি দিয়েও শিক্ষা, প্রশাসন ও ব্যবসায়ের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তাঁর ক্ষমতার হার বের করা যায় না। যে প্রবন্ধ সংখ্যার সাহায্যে পাঠককে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায়, সেই প্রবন্ধের প্রথম দায়িত্ব সংখ্যার উৎস দেওয়া।
মণ্ডল কমিশন নিয়েও লেখায় সমস্যা আছে। সেখানে কমিশনকে মূলত “তপসিলিশ্রেনী ভুক্ত নিম্নবর্ন হিন্দুদের” সুযোগ সুবিধার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতের সামাজিক ন্যায়বিচার মন্ত্রণালয়ের বিবরণ অনুযায়ী মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ ছিল অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি, অর্থাৎ ওবিসি জনগোষ্ঠী নিয়ে; তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতির জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে এটি আলাদা। এই পার্থক্য মুছে দিলে জাতপাতের ইতিহাস সম্পর্কে পাঠক ভুল ধারণা পান।
লেখক আরও বলেছেন, আম্বেদকর গান্ধীর অনুরোধে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। সরকারি আম্বেদকর ফাউন্ডেশন ১৯৫৬ সালে তাঁর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের তথ্য দেয়। কিন্তু “গান্ধীর অনুরোধে” সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবিটির পক্ষে লেখায় দলিল নেই। আম্বেদকরকে আলোচনায় আনতে হলে তাঁর সিদ্ধান্ত ও চিন্তাকে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থানের মধ্যেই দেখতে হবে। তাঁর Annihilation of Caste জাতব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে সমাজ গড়ার আহ্বান। সেটিকে একটি দেশের সব মানুষের বিরুদ্ধে, অন্য দেশের সব মানুষের পক্ষে সহজ রায়ে পরিণত করা তাঁর ভাবনার প্রতি সুবিচার নয়।
ড. বি. আর. আম্বেদকর তাঁর Pakistan or the Partition of India গ্রন্থে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের পেছনে “বাঙালি হিন্দু অভিজাতদের” স্বার্থ এবং পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের অগ্রগতি ঠেকানোর আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন। এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে একমাত্র ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, আম্বেদকর এখানে সঠিকভাবে উল্লেখিত হননি।
খেয়াল করুন যে, আম্বেদকরের মূল যুক্তিটি ছিলো শ্রেনী যাঁরা ধ র্মীয় পরিচয়ে ছিলেন হিন্দু; তিনি “হিন্দু” বলতে এঁদেরকেই বুঝিয়েছেন; সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের নয়।
আম্বাদকরের বক্তব্যের সাথে আমি যেটি যোগ করতে চাই সেটি হলো, উচ্চশ্রেনীর হিন্দুরা না হয় মুসলমানদের ঠেকিয়ে রাখতে চেয়েছিলো; কিন্তু উচ্চশ্রেনীর মুসলমানদের কী ভূমিকা ছিলো? কতজন মুসলমান জমিদার মুসলমান প্রজাদের খাজনা মাফ করেছেন? যদি না করে থাকেন বা তুলনামূলকভাবে কম করে থাকেন তবে এর কারন কী ছিলো? এটি কি এজন্য যে তাঁরা “মুসলমান” ছিলেন, নাকি তাঁরা “জমিদার” ছিলেন? ইতিহাসবিদ জয়া চট্টোপাধ্যায় Bengal Divided গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে বঙ্গভাগের প্রশ্নে হিন্দু ভদ্রলোক ও জমিদার শ্রেণির স্বার্থ অবশ্যই সক্রিয় ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের নীতি, আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জমিদারি স্বার্থ (হিন্দু ও মুসলিম উভয়ই), শিক্ষাগত বৈষম্য এবং মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও কাজ করেছে। অন্যদিকে সুমিত সরকার তাঁর The Swadeshi Movement in Bengal, 1903–1908 গ্রন্থে স্বদেশি আন্দোলনের জাতীয়তাবাদী, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বিপ্লবী নানা স্তর বিশ্লেষণ করেছেন।
অতএব আম্বেদকরের একটি বক্তব্যকে ব্যবহার করে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে মুসলমানবিরোধী বলে চূড়ান্ত ঘোষণা করা ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে সংকুচিত করা। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে হিন্দু অভিজাত স্বার্থ ছিল, এই সত্য স্বীকার করা যায়; কিন্তু সেখান থেকে প্রত্যেক হিন্দু জাতীয়তাবাদী, প্রত্যেক বিপ্লবী এবং বিশেষ করে প্রীতিলতাকে মুসলমানদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
আরিফুল হক প্রীতিলতা সম্পর্কে আরেকটি অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন এই বলে যে, প্রীতিলতার পারিবারিক টাইটেলটি এসেছে মুসলিম নবাবদের কাছ থেকে; এটি বলে প্রীতিলতাকে তিনি প্রচন্ড হেয় প্রতিপন্ন করেছেন এই বলে, “প্রীতিলতা নামের শেষে ওয়াদ্দেদার যে টাইটেলটি লাগনো ,সেটিও কিন্তু এক মুসলমান নবাবের দেয়া উপাধিগৌরবের চিহ্ন ।“ তাঁর কাছে আমার ছোট্ট প্রশ্নঃ খান বাহাদূর উপাধি যাঁরা পেয়েছিলেন তাঁদের এটি যাঁরা দিয়েছিলেন তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় কী ছিলো? এসব পদবী কি সব সময় দয়া করে দিতেন শাসকরা? এর উত্তর হক সাহেবের কাছে চাইবো আমি।
যে ইতিহাস আমাদের একসঙ্গে দেখতে হবে
পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকদের বঞ্চনার পেছনে জমি, খাজনা, শিক্ষা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অসম বণ্টন কাজ করেছে। এসব সংঘাত বহু ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের রেখার সঙ্গেও মিলে গেছে; পরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সেই রেখাকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে। কিন্তু মুসলিম জমিদার ও মুসলিম কৃষকের স্বার্থ এক ছিল না। হিন্দু অভিজাত ও হিন্দু দরিদ্রের অবস্থাও এক ছিল না। দ্বিজাতি তত্ত্বের রাজনৈতিক শক্তি বুঝতে হলে শ্রেণিগত বঞ্চনা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের সম্পর্ক, দুটোই দেখতে হবে। একটিকে দিয়ে অন্যটিকে মুছে দিলে ইতিহাস বিকৃত হয়।
আরিফুল হকের প্রথম লেখা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ‘ভিক্ষা’ বলে ছোট করেছে; দ্বিতীয় লেখা বাংলাদেশি হিন্দুদের জীবন সম্পর্কে এক ব্যক্তির গল্প দিয়ে নিশ্চয়তা দিয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই মানুষের নিজের ইতিহাসের চেয়ে লেখকের তৈরি ধর্মীয় ছকটি বড় হয়ে উঠেছে। তিনি একটি বড় জনসংখ্যাকে অপমান করেছেন যাঁদের ধর্মীয় পরিচয় “হিন্দু”। এইটিই দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষময় ফল।
আমরা উপেক্ষিত মুসলিম সংগ্রামীদের যথার্থ স্থান চাইতে পারি, প্রীতিলতার অভিযান নিয়ে কঠিন প্রশ্ন করতে পারি, ভারতের জাতপাতের নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের অভিজ্ঞতাও শুনতে পারি। এসবের একটিও বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একই নিয়ম সকলের জন্য প্রয়োগ করা: যে উদ্দেশ্য আরোপ করা হচ্ছে তার দলিল দিন, যে সংখ্যা দেওয়া হচ্ছে তার উৎস দিন, আর যে মানুষের হয়ে কথা বলা হচ্ছে, তাঁর নিজের কণ্ঠও শুনুন।
ইতিহাস তখনই আমাদের হবে, যখন তাকে ধর্ম অনুসারে ভাগ করে ছোট করা বন্ধ করব। হক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি উপাদান “ধর্ম”কেই সংস্কৃতি ভাবছেন; আমরা সংস্কৃতির সব উপাদানকে নিয়ে এটির সংজ্ঞা নির্ধারন করি, এবং এটির ইতিহাসের কথা বলতে চাই; আমরা হক সাহেবের শৈল্পিক কর্মকান্ড নিয়ে গর্বিত হতে চাই; তাঁর মুসলমান পরিচয় নিয়ে নয়, কারন মুসলমান হওয়ার কারনে তিনি বিখ্যাত অভিনয় শিল্পী হননি, বিখ্যাত হওয়ার পর আমরা জেনেছি তাঁর নাম আরিফুল হক। এভাবেই তিনি আমার সংস্কৃতির অংশ, এবং আমরা সবাই মিলেই একটি সংস্কৃতি।