বগুড়ায় কালীমন্দিরে ভাঙচুর, দানবাক্সের টাকা ও পূজার সামগ্রী চুরি
বগুড়ার নন্দীগ্রামে একটি কালীমন্দিরে ভাঙচুরের পর দানবাক্সের টাকা ও বিভিন্ন পূজার সামগ্রী চুরির অভিযোগ উঠেছে। এ সময় মন্দিরের একটি মূর্তি পাশের ডোবার মধ্যে ফেলে রাখা…
কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে একদল যুবকের গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে শ্মশানের চিতা ও মৃত ব্যক্তির সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজন যুবককে শ্মশান এলাকায় বসে মাংস রান্না ও খেতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে গরুর মাংস রান্না করা হয়েছিল।
ঘটনাটি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের হরিনারায়ণপুর বাজার মহাশ্মশানে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে ‘অনিক হোসেন’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে সংশ্লিষ্ট ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ভিডিও ও কয়েকটি ছবিতে থাকা কয়েকজনকে স্থানীয়ভাবে শনাক্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। তাঁদের বাড়ি হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের আব্দালপুর ও শান্তিডাঙ্গা এলাকায় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। তবে অভিযুক্ত যুবকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে কয়েকজনকে শ্মশানের চিতার ওপর এবং একটি সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে দেখা গেছে বলেও স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে শ্মশান মৃত স্বজনদের শেষকৃত্য, ধর্মীয় আচার এবং স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র স্থান। ফলে সেখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলেন, কোনো ধর্মের পবিত্র স্থানেই এ ধরনের আচরণ কাম্য নয়। তবে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তাঁরা কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চান না। তাঁদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের দায় পুরো কোনো সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো উচিত নয়। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের কয়েকজন আরও দাবি করেন, হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে এর আগেও সমাধি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কখনো কখনো শ্মশান এলাকায় মাংসের হাড়গোড় ও রান্নার আলামত পাওয়া গেছে বলেও তাঁদের দাবি। তবে আগের এসব ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে থাকা কয়েকজনকে স্থানীয়ভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা বা আনুষ্ঠানিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঘটনার পর মীমাংসার সময় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মামুনুর রশীদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তবে ওসি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, শ্মশান কমিটির নেতাদের থানায় আসতে বলা হয়েছে। তাঁরা থানায় এলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি সুবাস কর্মকার বলেন, এ ধরনের ঘটনা কারও কাম্য নয়। ঘটনাটিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা রক্ষা সবার দায়িত্ব। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি পূজা উদযাপন ফ্রন্ট নেতা তাপস কুমার সাহা দেখভাল করছেন বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও হরিনারায়ণপুরের বাসিন্দা তাপস কুমার সাহা বলেন, একটি ঘটনা ঘটেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, শ্মশান এলাকার মানুষ ভবিষ্যতে সেখানে পাহারা দেবেন।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তাপস কুমার সাহা বলেন, এ বিষয়ে শ্মশান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলতে পারবেন। তবে তাঁর মতে, ঘটনাটি দুঃখজনক এবং আইনগতভাবে তদন্তের দাবি রাখে।
এদিকে বিষয়টি মীমাংসার প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য বিপুল কুমার সাহাকে মারধর করে একটি মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বক্কর নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁকে মারধরের অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রকাশিত স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে হরিনারায়ণপুরের লক্ষণ জুট মিলসংলগ্ন একটি গোডাউনের সামনে মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। বিপুল কুমার সাহাকে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার আইনগত দিক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের উদ্দেশ্য বা এমন জ্ঞান থাকা অবস্থায় কোনো উপাসনালয়, সমাধিস্থল, শেষকৃত্যের স্থান বা মৃতদেহের অবশেষ সংরক্ষিত স্থানে অনধিকার প্রবেশ, মৃতদেহের প্রতি অবমাননাকর আচরণ কিংবা শেষকৃত্যে বিঘ্ন ঘটানোর মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে এই ঘটনায় ঠিক কোন আইনি ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া তথ্য, ঘটনার প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ওপর। একইভাবে চিতা বা সমাধির ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, শ্মশানে মাংস রান্না করা কিংবা সেখানে প্রবেশের ঘটনায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তাঁরা কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চান না। তাঁদের প্রত্যাশা, পুলিশ ও প্রশাসন ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
একই সঙ্গে স্থানীয়রা শ্মশানের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ধর্মীয় স্থান নিয়ে কোনো ঘটনা ঘটলে সেটিকে কেন্দ্র করে কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামগ্রিক অভিযোগ না তুলে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা জরুরি।
হরিনারায়ণপুরের সচেতন মহলের মতে, দেশের সব ধর্মের উপাসনালয়, শ্মশান, কবরস্থান ও অন্যান্য ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানের প্রতি সম্মান দেখানো সবার দায়িত্ব। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তিতে সামাজিক চাপ বা জোরপূর্বক মীমাংসার পরিবর্তে আইনগত প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au