বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ভীণা সিক্রি। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ভীণা সিক্রি। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশ ছাড়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থার প্রভাব বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী ও পাকিস্তানকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
সাবেক এই ভারতীয় কূটনীতিকের ভাষ্য, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ‘আগুন নিয়ে খেলছে’। তাঁর মতে, ভারতের সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেও বাংলাদেশ ভুল করেছে।
সম্প্রতি ভারতের সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ভীণা সিক্রি এসব মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, জামায়াতে ইসলামীর উত্থান, পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রভাব এবং দেশটির সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
ভীণা সিক্রি ২০০৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি কীভাবে দেখছেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান এবং ইসলামপন্থীদের কর্মকাণ্ডে বাধা না থাকার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ‘পাকিস্তান ২.০’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর মত জানতে চাওয়া হয়।
জবাবে ভীণা সিক্রি বলেন, প্রথমেই ২০২৪ সালে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, তার প্রকৃতি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের ঘটনাকে কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। তাঁর মতে, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ও সুপরিকল্পিত সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
সিক্রি বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে যা ঘটেছে, তা শুধু শিক্ষার্থীদের একটি গণঅভ্যুত্থান ছিল না। এটি ছিল একটি সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পিত এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সাজানো সরকার পরিবর্তনের অভিযান।’
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনটি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না, বরং সংগঠিত ছিল, এমন বক্তব্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও দিয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে ইউনূস সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভীণা সিক্রির মতে, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর প্রভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। তাঁর বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীকে এ পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও পাকিস্তানকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিকে অবহেলা করা হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামপন্থীদের প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সাক্ষাৎকারে ভীণা সিক্রি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা একটি অস্তিত্বসংকটের মুখোমুখি হতে পারেন।
তিনি একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়েও মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এটিকে তিনি বাংলাদেশের একটি ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভীণা সিক্রির বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে সম্ভাব্য বিদেশি প্রভাব এবং পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর অবস্থান শক্ত হওয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের প্রভাবের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। | ছবি: রয়টার্স
তবে সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত এসব বক্তব্য ভীণা সিক্রির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন। এগুলোকে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ‘পরিকল্পিত সরকার পরিবর্তনের অভিযান’ হিসেবে দেখার যে দাবি সিক্রি করেছেন, সেটিও তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
সিক্রি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সতর্ক করে বলেন, ইসলামপন্থী শক্তি এবং পাকিস্তানের প্রভাবকে জায়গা করে দিয়ে দেশটির নেতৃত্ব এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। এ কারণেই তিনি পরিস্থিতিকে ‘আগুন নিয়ে খেলা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ এর আগেও প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৪ সালের পর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ইসলামপন্থী শক্তির উত্থান নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
সাক্ষাৎকারে ভীণা সিক্রির বক্তব্যের সারকথা হলো, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্রঃ ফাস্ট পোস্ট