নিরাপত্তার জন্য দেশ ছাড়লেও সাংবাদিকতা ছাড়েননি বাংলাদেশি সাংবাদিক
নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এক সাংবাদিক বলেছেন, দেশ থেকে দূরে থাকলেও সাংবাদিকতা থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। ইউরোপীয় সেন্টার ফর প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া ফ্রিডমকে…
ইতিহাস কোনো নিছক কালপঞ্জি বা অতীতের মৃত দলিল নয়; ইতিহাস হলো একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দর্পণ, অস্তিত্বের মূল শেকড়। সেই শেকড়েই যখন কুঠারাঘাত করা হয়, তখন তা কেবল একটি বই বা একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না-তা হয়ে ওঠে গোটা জাতির মুক্তবুদ্ধি, বাকস্বাধীনতা এবং অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাবাজারে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রিকে কেন্দ্র করে যে ন্যাক্কারজনক তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেকের সামনে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
কোনো ধরনের আইনি নোটিশ, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা আদালতের নির্দেশ ছাড়াই সংঘবদ্ধ মব বা জনতা কর্তৃক একটি স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা আইনের শাসনের চরম লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে ধরে নিয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে আটকে রাখা এবং বই বিক্রি না করার শর্তে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার মতো ঘটনা স্বাধীন প্রকাশনা শিল্পের জন্য একটি অশনিসংকেত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বই বিক্রির অপরাধে প্রকাশনা সংস্থায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া বা পুলিশি হেনস্তার শিকার হওয়া কেবল অনভিপ্রেত নয়, বরং এটি সরাসরি বাকস্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার টুঁটি চেপে ধরার শামিল।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যখন অন্ধত্বে রূপ নেয়, তখন তা ইতিহাসকে অস্বীকার করার মতো অবাস্তব খেলায় লিপ্ত হয়। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত জীবনের চালচিত্র নয়; এটি এই জনপদের দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন, সংগ্রাম এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে ওঠার ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল। নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সন্ধান দিতে এবং সত্য ইতিহাস জানাতে এই গ্রন্থের ভূমিকা অপরিসীম।
একটি জাতিকে আদর্শিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করতে হলে সবার আগে তার ইতিহাসকে মুছে ফেলার যে পুরনো কৌশল স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যুগে যুগে চালিয়ে এসেছে, সাম্প্রতিক এই হামলা তারই একটি ধারাবাহিক রূপ মাত্র।
তবে ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর এবং সত্য বড় অপ্রতিরোধ্য। শক্তিপ্রয়োগ করে, মব সৃষ্টি করে কিংবা বলপূর্বক কোনো বইয়ের বিপণন বন্ধ করে কখনো সত্যকে দাবিয়ে রাখা যায় না।
জাতির পিতার আদর্শ ও তাঁর অমর কীর্তিগুলো কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে। সাময়িক রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে বা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে যারা মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে রুদ্ধ করতে চায়, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করে না।
আজ সময় এসেছে এই ধরনের উগ্র ও সংকীর্ণ অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াবার। বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সচেতন জনগণ যেকোনো মূল্যে এই ধরনের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে-এটাই সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।
(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।)
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au