বেওয়ারিশ লাশ দাফনের দাতব্য সংস্থা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীতে বাড়ছে বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা। গত পাঁচ বছরে ঢাকায় আড়াই হাজারেরও বেশি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করেছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই দাফন করা হয়েছে ৪০০টি মরদেহ।
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাজধানীতে ৪৪৩টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯০টিতে। ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৪টি মরদেহ দাফন করা হয়। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ। অর্থাৎ ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছরই এ সংখ্যা বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরে মোট ২ হাজার ৫৪৭টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করেছে সংস্থাটি। গড়ে প্রতিবছর দাফন করা হয়েছে প্রায় ৫০৯টি মরদেহ। সে হিসাবে রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত একটি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন হচ্ছে।
তবে বেওয়ারিশ মরদেহ মানেই ওই ব্যক্তির কোনো স্বজন নেই—বিষয়টি এমন নয়। জীবিত অবস্থায় পরিবার, স্বজন ও পরিচয় থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর পর অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে স্বজন থাকলেও তাদের কাছে মরদেহ পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, নিঃসঙ্গ মৃত্যু, মানসিক ভারসাম্যহীনতা কিংবা নিখোঁজ থাকার মতো বিভিন্ন কারণে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় মরদেহের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পরিচয় শনাক্তের প্রয়োজনীয় কোনো নথি পাওয়া যায় না। দুর্ঘটনায় চেহারা বিকৃত হয়ে গেলেও পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়।
এ ছাড়া রাজধানীতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসা-যাওয়া করেন। তাদের মধ্যে কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব না হলে মৃত্যুর পর পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিঃসঙ্গ ও ঠিকানাবিহীন মানুষের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে।
মরদেহ শনাক্তে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ছবি, আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও পারিপার্শ্বিক সূত্র ব্যবহার করে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় অনেক অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। তবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের পরিসংখ্যান বলছে, শনাক্তকরণ ব্যবস্থার উন্নতির পরও প্রতিবছর কয়েক শ মরদেহ পরিচয়হীন অবস্থায় দাফন করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি শুধু মানবিক সংকট নয়; এর সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণ, দ্রুত পরিচয় শনাক্তকরণ, হাসপাতাল ও পুলিশের তথ্যের সমন্বয় এবং পরিবার-স্বজনের কাছে মরদেহ পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতার বিষয়টিও জড়িত। তাই বেওয়ারিশ মরদেহের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পরিচয় শনাক্তের বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মৃত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা স্বজনদের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধান, দুর্ঘটনা ও অপরাধের তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়ার জন্যও তা জরুরি। রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও প্রশাসনিক বিষয় হয়ে উঠেছে।