বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে এবং জনগণের কণ্ঠস্বর ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
লন্ডনে অধিকার, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশে আইনের শাসন নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা। কানাডাভিত্তিক গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স (GCDG) আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের কণ্ঠস্বর তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেন বাংলাদেশের জনগণ নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, এটি তাঁর দায়িত্ব এবং এ বিষয়ে তাঁর অঙ্গীকার রয়েছে। তিনি সেই দায়িত্ব ও অঙ্গীকার থেকে সরে যাবেন না।
দেশে যোগাযোগ রাখার দাবি শেখ হাসিনার
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বলেন, তিনি প্রতিদিন বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য ও খবর পান। এর মাধ্যমে তিনি দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলেও ইঙ্গিত দেন।
তিনি দাবি করেন, দেশের ভেতরে কী ঘটছে সে বিষয়ে তিনি অবগত রয়েছেন। ভারতে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের অভিজ্ঞতা এবং দেশের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তিনি নিয়মিত খবর পাচ্ছেন বলে জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, গত বছর একটি ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, সে বিষয়েও তিনি অবগত। তবে সুযোগ পেলে দেশে ফিরে তিনি ওই অভিযোগ ও মামলার মুখোমুখি হতে চান বলে জানান।
তিনি বলেন, দেশে ফিরে এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান, তবে সে জন্য তাঁকে দেশে যাওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে।
আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার সমালোচনা সজীব ওয়াজেদের
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ছেলে ও তাঁর সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদও ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন।
তিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। সজীব ওয়াজেদের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে ইউনূস সরকার একাধিক সীমালঙ্ঘন করেছে।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখাকে তিনি বড় ধরনের একটি ‘লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে গুরুতর বিষয়।
সজীব ওয়াজেদের বক্তব্য ছিল অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বক্তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়নের অংশ। এ বিষয়ে অন্য পক্ষের বক্তব্য ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
১৯৭২ সালের সংবিধান পুনর্বহালের আহ্বান
লন্ডনভিত্তিক এ আলোচনায় বাংলাদেশের সংবিধান নিয়েও বক্তব্য দেন সাংবাদিক ও সম্পাদক সৈয়দ বদরুল আহসান। তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনর্বহালের আহ্বান জানান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছিল। তাই সেই সাংবিধানিক কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।
বাংলাদেশে ‘রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ’ হয়েছে: হাবিবে মিল্লাত
সেমিনারে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্সের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত বাংলাদেশের গত দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে গত দুই বছরে ‘রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ’ ঘটেছে। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য ও কর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয়টিও উঠে আসে।
হাবিবে মিল্লাতের মতে, বিপুলসংখ্যক সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক কর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির গ্রেপ্তারের খবর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পশ্চাদপসরণের একটি ইঙ্গিত।
GCDG নিজেদের ওয়েবসাইটে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সুশাসন নিয়ে গবেষণা, আলোচনা ও আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজনের কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পরিস্থিতি নিয়েও একাধিক আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল সম্মেলন করেছে।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা
শেখ হাসিনার বক্তব্যটি এমন সময়ে এলো, যখন তাঁর সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। বক্তব্যে তিনি নিজেই দেশে ফিরে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
তবে দেশে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময়, এর আইনগত প্রক্রিয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর বিষয়ে এই বক্তব্যে বিস্তারিত কোনো রূপরেখা দেওয়া হয়নি।
সেমিনারে বক্তাদের আলোচনায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সংবিধান এবং নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মত উঠে আসে। শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন, আর সজীব ওয়াজেদ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বক্তাদের মধ্যে কেউ বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে মত দেন, আবার কেউ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘পশ্চাদপসরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ফলে পুরো আলোচনা মূলত বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
সূত্রঃ স্টার নিউজ গ্লোবাল