রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবিঃ সংগৃহীত
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বড় একটি বাধা কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। নিরাপত্তা ভাল্বের ত্রুটি মেরামতের পর ১৬ মেগাপাসকেল উচ্চচাপের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করে চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তবে উৎপাদন শুরু হলেই একসঙ্গে পুরো সক্ষমতার বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, শুরুতে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে আরও আট থেকে ১০ মাস সময় লাগতে পারে।
এ কারণে রূপপুরের বিদ্যুৎ আগামী গ্রীষ্মে দেশের লোডশেডিং কতটা কমাতে পারবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন শুরুর সময়, উৎপাদনের গতি এবং সে সময়ের বিদ্যুতের চাহিদার ওপর। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিটি ধাপের পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় উৎপাদন শুরুর নির্দিষ্ট সময় এখনই নিশ্চিত করা কঠিন।
এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালানও দেশে এসে পৌঁছেছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কয়েকটি চালানে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ করার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। ১৬ মেগাপাসকেল চাপের পরীক্ষা সফল হওয়ার পর প্রায় ১৮ মেগাপাসকেল চাপে আরও একটি পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে নিরাপত্তা ভাল্বের ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিটের কমিশনিংয়ের সময়সূচি পিছিয়ে যায়।
কবে পাওয়া যাবে রূপপুরের বিদ্যুৎ?
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন জানিয়েছেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগে বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এ সময় কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধান করে আবার পরীক্ষা চালাতে হয়। সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পরই একটি ইউনিট বাণিজ্যিকভাবে চালু করা সম্ভব।
তাই চলতি বছরের শেষ দিকে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে উৎপাদন শুরুর প্রত্যাশা থাকলেও রূপপুরের বিদ্যুৎ পাওয়ার নির্দিষ্ট সময় এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এলেই কি কমবে লোডশেডিং?
রূপপুরের প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, দেশজুড়ে লোডশেডিংও সরাসরি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পরিমাণ কমে যাবে।
লোডশেডিং কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে ওই সময় দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা, অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন এবং জাতীয় গ্রিডের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শীতকালে রূপপুর চালু হলে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকতে পারে। তবে গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় রূপপুরের উৎপাদন শুরু হলে লোডশেডিং কমাতে কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামনে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা
চলতি গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। গত ১১ আগস্ট রাত ১২টায় দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল। ওই দিন রাত ৯টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৪৩ মেগাওয়াট।
বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর বাড়তে থাকায় আগামী গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা ২০ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। সে সময় রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেবে।
তবে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। চলতি বছরও জ্বালানি ও গ্যাসের সংকটে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের সংযোজন হবে এবং বিশেষ করে চাহিদার সময়ে লোডশেডিং কমাতে সহায়তা করবে। তবে আগামী গ্রীষ্মে বাস্তবে কতটা লোডশেডিং কমবে, তা নির্ভর করবে রূপপুরের উৎপাদন কত দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছায়, দেশের বিদ্যুতের চাহিদা কতটা বাড়ে এবং একই সময়ে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।