বাংলাদেশ

রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই সম্মিলিত অপরাধের ভিত্তি হতে পারে না: জেনেভা সম্মেলনে শেখ হাসিনা

  • 7:13 pm - October 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৯৯৮ বার
জেনেভা সম্মেলনে শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। শুক্রবার জেনেভা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এ সেমিনারে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সাবেক রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

‘বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট: শিক্ষার অধিকার, নির্বিচার আটক ও সাজানো ট্রাইব্যুনাল রায়’ শীর্ষক সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টস এবং তুমুকু ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কালচারাল ইউনিয়ন। জেনেভা সময় বিকেল ৫টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে মূল বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ ছাড়া বক্তব্য দেন গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টসের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. হাবিবে মিল্লাত, সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পাওলো কাসাকা, জার্মানির সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের গবেষণা পরিচালক ড. জিগফ্রিড ও. উলফ, জাপানের মানবাধিকারকর্মী শিনিচি ফুজিকি, সিডস-আফ্রিকার সভাপতি কার্ল গুস্তাভ বিয়ার্টনেস, জেনেভা স্কুল অব ডিপ্লোমেসির অধ্যাপক আলফ্রেড দে জায়াস, ক্যামেরুনের সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস অ্যাডভোকেসির সভাপতি ড. চনসি আয়াচ জোসেফ এবং সুইডিশ আইনজীবী মোনা হাগো স্ট্রিন্ডবার্গ।

শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুতর সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ জনগণের স্বাধীন ও সচেতন মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ওই সময়ের পর দেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নির্বিচার আটক এবং রাজনৈতিক প্রভাবাধীন আইনি কার্যক্রমের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের শিক্ষা ও কর্মজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, সংবিধান শুধু একটি আইনি দলিল নয়, এটি নাগরিকদের নির্বিচার ক্ষমতা থেকে সুরক্ষা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধানের নিশ্চয়তা দেয়। তার অভিযোগ, বর্তমানে এসব মৌলিক নীতি গুরুতর চাপের মুখে রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তাহীনতার বিভিন্ন ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, এসব ঘটনার অনেক কিছুই গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় না। তাই বিষয়টিকে শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতা হিসেবে না দেখে আইন, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত সংকট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কিছু শিক্ষার্থী ছাত্রত্ব বা সনদ হারিয়েছেন এবং তরুণ পেশাজীবীদের কেউ কেউ চাকরি থেকে বরখাস্ত বা সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই সম্মিলিত অপরাধের ভিত্তি হতে পারে না। কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ প্রমাণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আটক ও বিচারব্যবস্থা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা দাবি করেন, আওয়ামী লীগের বহু নেতা, কর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়েছে, মামলা দেওয়া হয়েছে অথবা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, সমান আচরণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে কীভাবে ফৌজদারি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে দিতে বিচারিক ও ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা। তার মতে, বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে রাষ্ট্রের কারও জীবন নেওয়ার মতো চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করা উচিত নয়। একই সঙ্গে কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তি ও তার সমর্থকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বাদ দিয়ে একটি নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল বলা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘ, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী সমাজ এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। নির্বিচার আটক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বন্ধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সুরক্ষা, কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তিনি।

১৯৭৫ সালে তার পরিবারের সদস্যদের, তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ, হত্যার প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে যে প্রতিহিংসার ওপর কোনো জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে পারে না। তিনি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে মানুষ মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করবে, আইন দুর্বল ও শক্তিশালী সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং রাষ্ট্র জনগণের কল্যাণে কাজ করবে।

গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টসের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. হাবিবে মিল্লাট বলেন, বাংলাদেশে আইনের শাসন, বিচারিক সুরক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে লাখ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দুই লাখের বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে। আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

হাবিবে মিল্লাত আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব পেশাজীবী, সাংবাদিক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পড়েছে। দুই শতাধিক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন এবং শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও মালিকানা পরিবর্তনের পাশাপাশি চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কারাগারের পরিস্থিতি তুলে ধরে হাবিবে মিল্লাত দাবি করেন, রাজনৈতিক বন্দীদের পর্যাপ্ত আইনি ও চিকিৎসা সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্প্রদায়, বিশেষ করে জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পাওলো কাসাকা বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাংবিধানিক বিরোধ বা সাধারণ রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর সঙ্গে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বৃহত্তর সংকটও জড়িত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেওয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, সাংবাদিকদের ওপর চাপ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের কারাগারে পাঠানোর অভিযোগ তুলে কাসাকা বলেন, এসব প্রবণতা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক চাপের বিষয়েও উদ্বেগ জানান তিনি।

জার্মানির সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের গবেষণা পরিচালক ড. জিগফ্রিড ও. উলফ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সংকুচিত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানান। তার অভিযোগ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসকদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং এসব পরিচয় হয়রানি, বহিষ্কার বা শারীরিক হামলার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন উলফ। তার মতে, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বাড়লে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নারীর স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একাডেমিক স্বাধীনতা রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা, শারীরিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জাপানের মানবাধিকারকর্মী শিনিচি ফুজিকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মৌলিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি নির্বিচার আটক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ এবং বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও নজরদারির আহ্বান জানান।

তিনি বাংলাদেশের বিষয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো একটি জরুরি আবেদনের কথা উল্লেখ করেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তার ও আইনি কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ জানান।

বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে ফুজিকি বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই এ ধরনের সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের সব মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি অনুপস্থিতিতে বিচার, প্রমাণ যথাযথভাবে প্রকাশ না করা, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া এবং দুর্বল আপিল ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ জানান।

সিডস-আফ্রিকার সভাপতি কার্ল গুস্তাভ বিয়ার্টনেস বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। নাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়সংগত আচরণ, শিক্ষা এবং জীবিকার সুযোগও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি অর্থনৈতিক অবস্থা ও বিচার পাওয়ার সুযোগের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরে বলেন, দরিদ্র মানুষ অনেক সময় অভিযোগের বিষয় বুঝতে, আইনজীবী নিয়োগ করতে এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার সময়ে চাকরি ধরে রাখতে বেশি সমস্যায় পড়েন।

কারাগারে অতিরিক্ত বন্দীর বিষয়টিও তুলে ধরেন বিয়ার্টনেস। তার মতে, কারাগারগুলোর সরকারি ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা অনেক বেশি এবং তাদের একটি বড় অংশ বিচারাধীন। দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জেনেভা স্কুল অব ডিপ্লোমেসির অধ্যাপক এবং জাতিসংঘের সাবেক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ আলফ্রেড দে জায়াস বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের অধিকার রয়েছে।

নির্যাতন, নির্বিচার আটক, গুম এবং বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন দে জায়াস। বাংলাদেশ যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষভুক্ত, সেগুলোর আওতায়ও এসব বিষয় পর্যালোচনা করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ক্যামেরুনের সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস অ্যাডভোকেসির সভাপতি ড. চনসি আয়াচ জোসেফ বলেন, আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় আইনের শাসনকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তিনি স্বাধীন নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিশেষ করে এমন একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সুইডিশ আইনজীবী মোনা হাগো স্ট্রিন্ডবার্গ বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে গুরুতর অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা বৈধ ও প্রয়োজনীয়। তবে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে কখনোই রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার করা প্রয়োজন। তবে যেকোনো জবাবদিহি প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।

স্ট্রিন্ডবার্গের মতে, কারও রাজনৈতিক পরিচয়, সাধারণ অভিযোগ বা জনচাপের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। ব্যক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে।

মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবিরের মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন স্ট্রিন্ডবার্গ। তিনি জানান, তিনি শাহরিয়ার কবিরের আইনজীবী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ শাহরিয়ার কবিরের আটক নিয়ে একাধিক উদ্বেগের বিষয় চিহ্নিত করেছিল।

তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তিকে আটক করার ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি, আটকের কারণ, বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ এবং আটকের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সম্পর্ক খতিয়ে দেখা জরুরি।

সেমিনারে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের সাংবিধানিক শাসন, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, শিক্ষার অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আটক, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মী ও জেনেভা প্রেস ক্লাবের সদস্য রহমান মামুনসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন এবং বিভিন্ন পর্বে আলোচনায় অংশ নেন।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা তৈরি এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে এ বিষয়ে সম্পৃক্ততা বাড়ানোই সেমিনারের অন্যতম উদ্দেশ্য।

সেমিনারে অংশ নেওয়া বক্তারা বাংলাদেশের আইনের শাসন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

এই শাখার আরও খবর

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছেন ভারতীয় হাইকমিশনার

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে যাওয়া এবং তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে নতুন করে…

বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রাজস্ব সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের আলোচনা

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রাজস্ব সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রোববার অর্থ…

ভোটার তালিকা ইস্যুতে উত্তাল ভারত, নির্বাচন কমিশন প্রধানের পদত্যাগ দাবি

ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ হয়েছে। রোববার রাজধানী নয়াদিল্লি ও মুম্বাইয়ে হাজারো…

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর বারবার হামলা, রহস্য কোথায়?

ঝিনাইদহ ও হবিগঞ্জের পর এবার কুষ্টিয়ায় হামলার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর। রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার লালন শাহ…

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক বিশ্বদীপ দাশ

ডিজিটাল মাধ্যমে দেশের অন্যতম শীর্ষ সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিশ্বদীপ দাশ। রোববার সংবাদমাধ্যমটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাকে এ…

বিমানের বহরে যুক্ত হচ্ছে ১০ এয়ারবাস, চুক্তি ৭ অক্টোবর

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে ১০টি নতুন এয়ারবাস উড়োজাহাজ যুক্ত করার বিষয়ে আগামী ৭ অক্টোবর চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au