রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি না পাওয়ার পর মামলার তদন্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি, পারিবারিক বিরোধ, আগামি চক্রবর্তীকে হয়রানি এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নর্থইস্ট নিউজ’ গত ২২ আগস্ট থেকে পরিচালিত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দাবি করেছে, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে স্থানীয় বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান সামু, গণপতি পরিবারের ঘনিষ্ঠ গৃহশিক্ষিকা ইভা রহমান এবং রংপুর মহানগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেরিল সুমন, ধীমান ঠাকুর ও প্রাণ ভট্টাচার্যর কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে কয়েকটি সূত্রের দাবি।
তবে এসব অভিযোগের বেশির ভাগই এখনো তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র, স্থানীয় সূত্র বা গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়।
ইভা রহমানকে খুঁজে পাওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন ইভা রহমান। মাছুয়াপাড়ার প্রতিবেশী ইভা গণপতি পরিবারের ছেলে আয়ুষের গৃহশিক্ষিকা ছিলেন। সে কারণে নিয়মিত তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন তিনি। একপর্যায়ে প্রীতিলতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি হয়।
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইভার সঙ্গে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। গোয়েন্দা শাখার উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর মাধ্যমে ইভা ও প্রীতিলতার সঙ্গে পুলিশ কমিশনারের পরিচয় হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
আগামি চক্রবর্তীকে স্থানীয় একটি চক্রের কথিত হয়রানি ও হুমকির বিষয়টি পুলিশকে জানাতে প্রীতিলতা ও ইভা সনাতন চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি শোনার পর সনাতন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে প্রীতিলতা ও ইভাকে পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের কাছে পাঠান বলে দাবি করা হয়েছে।
এরপরই পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে ইভা রহমানের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে ইভা রহমান বা আবদুল মাবুদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২২ আগস্ট থেকে ইভা রহমানকে এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে তাঁর পরিবার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যও প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

আগামী চক্রবর্তীর নিথর দেহ ছাদে টানতে দেখেছেন প্রতিবেশী কয়েকজন। ছবিঃ সংগৃহীত
আগামীর ওপর হয়রানি ও রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ
গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে ঘিরে স্থানীয় কয়েকজনের হয়রানি ও হুমকির অভিযোগ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, মেরিল সুমনের নেতৃত্বাধীন একটি কথিত চক্র আগামীকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করত। ওই চক্রে পারভেজ, পাভেল, মোমিন মিয়া, আবু হুমায়রাসহ আরও কয়েকজনের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হয়রানির পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমানের ছেলে আশফাক সিফাতের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, গণপতি পরিবার একটি নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করেছিল, এমন অভিযোগ তুলে আগামীকে একাধিকবার হুমকি দেওয়া হয়। একই কারণে বৃহত্তর রংপুরের কিছু এলাকায় হিন্দু পরিবারগুলোকেও স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা হুমকি দিচ্ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব রাজনৈতিক অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চেয়েছিলেন আগামি
হয়রানির ঘটনায় আগামী তাঁর মাকে পুলিশে অভিযোগ করতে বলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি তাঁর প্রতিবেশী ও বন্ধু প্রথা মণ্ডলকেও জানিয়েছিলেন তিনি।
ঘটনার কয়েক দিন আগে আগামি তাঁর বন্ধু প্রথাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে প্রশ্ন করেছিলেন, থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করলে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে কি না।
এই কথোপকথন থেকে আগামি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং পুলিশের কাছে সুরক্ষা চাওয়ার কথা ভাবছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার খবরে স্বজনদের আহাজারি। ছবিঃ সংগৃহীত
গণপতির বাড়ি নির্মাণ ও ১৫ লাখ টাকা কোথায়?
হত্যাকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি নির্মাণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের কয়েক সপ্তাহ আগে গণপতি তাঁর অসমাপ্ত বাড়ির নির্মাণকাজ আবার শুরু করেন। মৃত্যুর প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন আগে তিনি ভবন নির্মাণের জন্য জিপিএফ বা অবসরকালীন তহবিল থেকে ১৫ লাখ টাকা তোলেন।
তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওই টাকা শেষ পর্যন্ত খরচ হয়নি এবং ব্যাংকেই জমা ছিল। এ বিষয়ে প্রতিবেদনের পক্ষ থেকে কিছু নথি দেখার কথাও বলা হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের বরাতে আরও দাবি করা হয়েছে, বাড়ি নির্মাণের কারণে গণপতির কাছে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতা চাঁদা দাবি করেছিলেন।
গণপতি নির্মাণকাজে অর্থ ব্যয়ের জন্য অবসরকালীন সঞ্চয় থেকে টাকা তোলার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত সেই টাকা উত্তোলন করেননি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক সহকারী শিক্ষক ছিলেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত হন।
তাঁদের পারিবারিক বাড়ি ছিল মিঠাপুকুর উপজেলার দেওলপুরের রাজারাম এলাকায়। পরে সেই বাড়ি ছেড়ে রংপুর নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়ায় বসবাস শুরু করেন তিনি।
প্রতিবেশী কানন রানি তাঁর কাছ থেকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশের বাড়ির পরিবার ও প্রথা মণ্ডল
গণপতি পরিবারের পাশের নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়িটি সুন্দরগঞ্জের দেবু মণ্ডলের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বাড়িতে দেবুর মামাতো ভাই হিমাংশু কুমার মণ্ডল পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।
হিমাংশু কুড়িগ্রামের উলিপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সাবেক সরকারি অধ্যাপক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হিমাংশুর স্ত্রী কানন রানি, ছেলে শুভ এবং মেয়ে প্রথা মণ্ডলকে নিয়ে পরিবারটি সেখানে থাকত। শুভ রংপুরের একটি বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে কাজ করেন। তাঁদের মেয়ে প্রথা রংপুরের কারমাইকেল কলেজের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী।
প্রথা ও আগামীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। আগামী তাঁর ওপর কথিত হয়রানির বিষয়টি প্রথার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় কয়েকজনের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন ভারতীয় নাগরিক মাঝেমধ্যে হিমাংশুর বাড়িতে যাতায়াত করতেন। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় বা তাঁর সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ধীমান ঠাকুর ও প্রাণকে ঘিরে অভিযোগ
মাছুয়াপাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে পুরোহিত ধীমান ঠাকুর ও তাঁর ছেলে প্রাণ ভট্টাচার্য পরণের স্থানীয় প্রভাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ধীমান দাসপাড়া মন্দিরের দেখভালের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান কীভাবে হবে এবং এসব অনুষ্ঠানে কত টাকা সংগ্রহ করা হবে, সে বিষয়েও তাঁর প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিজেকে বিএনপির নতুন সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পর ধীমানের সঙ্গে রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামুর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
আগামীকে বিয়ের প্রস্তাব
ধীমান ঠাকুরের পরিবার থেকে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর ছেলে প্রাণ ভট্টাচার্য পরণের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। গণপতি চক্রবর্তী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরিবারের একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামীর সঙ্গে ‘আদিত কর’ নামে অন্য একজনের বিয়ের কথাবার্তাও চলছিল, কিন্তু আগামীর বাবা সেই সম্পর্কে রাজি ছিলেন না।
একটি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণপতির বাড়ি নির্মাণের জন্য অর্থ দাবি, পরণের সঙ্গে আগামীর বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
সামুর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ
রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু হত্যাকাণ্ডের তদন্তের গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে একটি গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্রকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হতো এবং গণপতি পরিবারের সঙ্গে ওই চক্রের বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
তবে সামুর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। একইভাবে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা বা হত্যাকাণ্ডে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার বিষয়ও এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
মেরিল সুমনের নাম বারবার কেন আসছে
তদন্তসংশ্লিষ্ট ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে মেরিল সুমনের নাম একাধিকবার উঠে এসেছে। তাঁকে আগামীকে হয়রানির অভিযোগে কথিত ‘সুমন গ্যাং’-এর নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মেরিল সুমন বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা গেলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন কয়েকটি সূত্র।
এ ছাড়া প্রাণ ভট্টাচার্য পরণের নামও তদন্তে বারবার এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আরও অন্তত চারজনের যোগাযোগ থাকতে পারে বলেও কয়েকটি সূত্রের দাবি।

মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
মাদক নিয়ে নতুন প্রশ্ন
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ প্রথমে দাবি করেছিল, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি পরিবারকে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতির বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। গণপতি তাঁদের দেখে ফেলায় তাঁকে হত্যা করা হয় এবং পরে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করা হয়।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাতে পুলিশ আরও জানিয়েছে, মুগ্ধ নয়টি এবং সিদ্ধার্থ আটটি ইয়াবা সেবনের কথা বলেছেন। তাঁদের বন্ধু সীমান্তও আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
তবে পরে দুই আসামির ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ৩০ আগস্ট রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁদের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। রংপুর মহানগর ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, পরীক্ষায় এমফিটামিন বা কোনো মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে হত্যাকাণ্ডের সময় আসামিরা মাদকাসক্ত ছিলেন কি না, সেই প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে।
হত্যার বর্ণনায় যে তথ্য দিয়েছে পুলিশ
আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ প্রথমে তাঁদের বন্ধু সীমান্তের বাসায় যান। সেখানে ইয়াবা সেবনের পর আরও ইয়াবা সংগ্রহ করেন তাঁরা।
পরে দেয়াল টপকে পাশের একটি বাড়ির ছাদে এবং সেখান থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে তাঁরা ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। একপর্যায়ে ভোর হয়ে যায়।
সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাঁদের দেখে ফেলেন। পুলিশ বলছে, তিনি চিৎকার করে আশপাশের মানুষকে জানিয়ে দিতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন দুই আসামি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতির গলায় গামছা পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন তাঁরা। পরে তাঁর মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখেন।
শব্দ পেয়ে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামি ছাদে এলে তাঁদেরও গলা চেপে এবং পরে রশি ব্যবহার করে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দির বরাতে জানিয়েছে পুলিশ।
আয়ুষকে কেন হত্যা করা হলো
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর দুই আসামি বাড়ির সিসিটিভি ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। নিচতলায় গিয়ে একটি প্লায়ার্স দিয়ে বৈদ্যুতিক তার কেটে দেন তাঁরা।
পরে ওপরতলায় গিয়ে গণপতির ঘরে প্রবেশ করলে দেখতে পান, তাঁর ছেলে আয়ুষ ঘুম থেকে উঠে গেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে তাঁর নাম ধরে ডেকেছিল।
এরপর তাকেও হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে এসেছে।
এই তথ্যটি পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনার সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন। তদন্তের শুরুতে শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে ধারণা করা হলেও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরেছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
গহনা ও টাকা নেওয়ার তথ্য
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, হত্যার পর দুই আসামি বাড়িতে থাকা টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়।
প্রায় ১৫ হাজার টাকা মুগ্ধ নিয়ে চলে যান। আর স্বর্ণালংকারের একটি ব্যাগ সিদ্ধার্থ নিয়ে একটি গলিতে যান এবং পরে স্থানীয় একটি বাড়ির পেছনে মাটির নিচে পুঁতে রাখেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।
সিদ্ধার্থ যেহেতু একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করতেন, তাই স্বর্ণালংকারের কোনটি আসল তা যাচাই করতে আগুনে গলিয়ে দেখেছিলেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
রংপুরের এই চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন কয়েকটি বিষয় পাশাপাশি তদন্ত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, হত্যাকাণ্ডের সময় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ সত্যিই মাদকাসক্ত ছিলেন কি না। দ্বিতীয়ত, ডোপ টেস্টের নেগেটিভ ফল এবং তাঁদের জবানবন্দিতে ইয়াবা সেবনের দাবির মধ্যে পার্থক্যের ব্যাখ্যা কী।
তৃতীয়ত, আগামীর ওপর কথিত হয়রানি ও হুমকির অভিযোগের বিষয়ে পরিবার পুলিশের কাছে আদৌ কোনো অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করেছিল কি না। চতুর্থত, গণপতির বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না।
পঞ্চমত, আগামীকে বিয়ের প্রস্তাব, সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং তাঁর অন্যত্র বিয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না।
ষষ্ঠত, মেরিল সুমন, প্রণ ভট্টাচার্য পরণ, ধীমান ঠাকুর, ইভা রহমান এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, গণপতি পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং সেই সময় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল।
বর্তমানে মামলার তদন্ত গোয়েন্দা পুলিশের হাতে রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ পরীক্ষা এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চারজন মানুষকে একই পরিবারের ভেতর থেকে হত্যার এই ঘটনায় শুধু দুই আসামির স্বীকারোক্তি নয়, তার বাইরের সম্ভাব্য সব যোগসূত্রও তদন্তে যাচাই করা হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ অভিযোগগুলো সত্য হলে হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক দ্বন্দ্বও ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। আর অভিযোগগুলো সত্য না হলে, সেগুলোকে বাদ দেওয়ার জন্যও একইভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ