শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছেন ভারতীয় হাইকমিশনার
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে যাওয়া এবং তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে নতুন করে…
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেছেন, সে সময় ভারতের সামনে কার্যত খুব বেশি বিকল্প ছিল না। কারণ, তখনও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এর অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত। অনুষ্ঠানের পঞ্চম আসরের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার প্রসঙ্গে প্রণয় ভার্মা বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে উদ্ভূত পরিস্থিতির বাস্তবতা মেনে নেওয়া ভারতের দায়িত্ব ছিল।
তিনি বলেন, “সে সময় তিনি (শেখ হাসিনা) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এ বিষয়ে আমাদের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। প্রতিবেশী হিসেবে জীবনের বাস্তবতা মেনে নেওয়া আমাদের দায়িত্ব ছিল। কারণ, কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার জন্য কেউ প্রস্তুত থাকে না।”
ভারতীয় রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ভারত যদি তখন শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাত বা তার বিমানকে অবতরণের অনুমতি না দিত, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াত তা বলা কঠিন।
শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি বলেও স্পষ্ট করেছেন প্রণয় ভার্মা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে বহনকারী একটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিমান ভারতে পৌঁছায়। এর আগে বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবনের দিকে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা সদস্যরা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।
প্রণয় ভার্মা বলেন, বাংলাদেশের সেই পরিস্থিতি “দুঃখজনক পরিস্থিতির” মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি বিশ্বের কোথাও যেন আর তৈরি না হয়, সেই প্রত্যাশাও জানান তিনি।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে যান। এরপর থেকে তিনি ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দিতে প্রথমে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে অনুরোধ জানায়। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও তার প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
তবে শেখ হাসিনাকে কবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন প্রণয় ভার্মা।
তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার ফেরার বিষয়ে কেউ কোনো সময়সীমা দিতে পারে না।”
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে একাধিকবার জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রচলিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে আছে। তার প্রত্যর্পণ নিয়ে মতপার্থক্যের পাশাপাশি ভারতে অবস্থানকালে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যও ঢাকার অসন্তোষের কারণ হয়েছে।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের সাজা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫ আগস্ট দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বরেই দেশে ফিরতে চান এবং দেশের পরিস্থিতি “সঠিক পথে” ফেরানোর জন্য কাজ করতে চান।
তিনি বলেন, তাকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে কিংবা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে, সে আশঙ্কা তিনি জানেন। তারপরও জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনা করে এই সরকার।
এই সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়।
২০২৫ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানায়।
পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। নতুন সরকারও আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে। একই কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও আলোচনা থমকে আছে।
ভারত গত মাসে তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাকে আলাদাভাবে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তিনি এখন পর্যন্ত নয়াদিল্লি সফর করেননি এবং ব্রিকস সম্মেলনেও যোগ দেননি।
বাংলাদেশ অবশ্য জানিয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হবে বলে তারা আশাবাদী। তবে সফরের কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
এদিকে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তার প্রথম টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বিএনপি সরকারের সঙ্গে তার প্রত্যর্পণের বিষয়টি তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে যুক্ত করার সমালোচনা করেন। তিনি জানান, ডিসেম্বরের মধ্যেই তিনি নিজ উদ্যোগে দেশে ফিরতে চান।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, সারসংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যার মধ্যে চীনের সঙ্গে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au