মতামত

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

মতামত: মানিক লাল ঘোষ

  • 9:57 pm - October 05, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৯৩ বার
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার আজীবন যোদ্ধা: অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের ইতিহাসে অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক ছিলেন এক উজ্জ্বল ও অনন্য ব্যক্তিত্ব। জ্ঞান, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর জীবন ছিল বহুমাত্রিক কর্ম ও সংগ্রামের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে ঢাকার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর প্রয়াণে জাতি হারাল একজন নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা, কৃতী বিজ্ঞানী, প্রথিতযশা শিক্ষক, কূটনীতিক এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার অকুতোভয় সৈনিককে।

নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের মির্জানগর গ্রামে জন্ম নেওয়া ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক শৈশব থেকেই মেধা, অধ্যবসায় ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় দেন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের শিখরে পৌঁছালেও তিনি কখনো নিজের শেকড়, মাতৃভূমি এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ভুলে যাননি। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার এক নিরন্তর সাধনা।

তিনি ছিলেন একজন কৃতী পদার্থবিজ্ঞানী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। বিজ্ঞানচর্চায় তাঁর মেধা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মর্যাদাপূর্ণ ইউনেস্কো তরুণ বিজ্ঞানী অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। সমাজ ও মানবকল্যাণে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেও তিনি মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক-এ ভূষিত হন। তাঁর এসব অর্জন ব্যক্তিগত গৌরবের পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও ছিল উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর কর্মজীবনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গৌরবময়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন এবং ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা কেন্দ্র—শক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলা এবং দেশের শক্তি ও জ্বালানি গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তবে তাঁর জীবন কেবল বিজ্ঞান ও শিক্ষাঙ্গনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ছাত্রজীবনেই তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরও দেশ ও মানুষের কল্যাণে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকে। পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রতিকূল রাজনৈতিক সময়েও তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে তিনি কখনো নীতির সঙ্গে আপস করেননি। ১/১১-এর জরুরি অবস্থার সময় একজন প্রথিতযশা অধ্যাপক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় নাগরিক হিসেবে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। তাঁর এই অধ্যায় প্রমাণ করে, তিনি কেবল বক্তৃতায় নয়, বাস্তব জীবনেও গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি ছিলেন অবিচল।

অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের জীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয়—তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এক নিরলস যোদ্ধা। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বাংলাদেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও মানবিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে তিনি আজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে শক্তিশালী করেন। তাঁর কাছে অসাম্প্রদায়িকতা কোনো আনুষ্ঠানিক স্লোগান ছিল না; এটি ছিল তাঁর জীবনদর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা ফাউন্ডেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এসব সংগঠনের মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন।
তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল কূটনীতি। নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একজন বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ হিসেবে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে তিনি কূটনৈতিক দায়িত্বেও কাজে লাগান। রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার এই দায়িত্ব তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বেরই আরেকটি উজ্জ্বল দিক।

অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের জীবনকে যদি এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে বলা যায়—তিনি ছিলেন জ্ঞান ও আদর্শকে কর্মে পরিণত করা একজন মানুষ। শিক্ষকতা তাঁকে দিয়েছে জ্ঞান বিতরণের সুযোগ, বিজ্ঞান তাঁকে দিয়েছে যুক্তিবাদী মনন, মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে দিয়েছে দেশপ্রেমের প্রেরণা, আর অসাম্প্রদায়িকতার আন্দোলন তাঁকে দিয়েছে মানুষের অধিকারের জন্য সংগ্রামের শক্তি।

তাঁর ব্যক্তিজীবনও ছিল নানা দায়িত্ব ও ত্যাগে পরিপূর্ণ। স্ত্রী আগেই পরলোকগমন করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই কন্যাসন্তানসহ অসংখ্য স্বজন, সহকর্মী, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর প্রয়াণ তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুসারী মানুষ এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজের প্রত্যাশী মানুষের জন্য গভীর বেদনার।

একজন মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন তাঁর পদ-পদবি দিয়ে হয় না; তাঁর মূল্যায়ন হয় তিনি সমাজ ও মানুষের জন্য কী রেখে গেলেন, তার ওপর। সেই বিচারে অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের জীবন নিঃসন্দেহে একটি আলোকবর্তিকা। তিনি দেখিয়ে গেছেন, উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা যায়; রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেও মানবিক মূল্যবোধকে অটুট রাখা যায়; এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আদর্শের পথে অবিচল থাকা সম্ভব।
আজ তিনি আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর কর্ম ও আদর্শ আমাদের সামনে রয়ে গেছে। তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ ও কর্মের মৃত্যু নেই। অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের জীবন তাই কেবল একটি ব্যক্তির জীবনী নয়; এটি একটি সময়ের ইতিহাস, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন এবং একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রত্যয়ের দলিল।

তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তাঁর আদর্শকে ধারণ করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়াই হবে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।
অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক আজ আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িকতার দীপ্ত আদর্শ বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

( মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক)

এই শাখার আরও খবর

আসন্ন বড় খাদ্য সংকটের জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ব বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধ, জ্বালানি ও সার সরবরাহে চাপ,…

‘আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই’

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার এক সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের…

ছেলেকে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় বাবাকেও গুলি করে হত্যা

খুলনার রূপসা উপজেলায় ছেলে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় তার বাবা আক্তার ঢালীকেও গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে মাগরিবের…

ইতিহাসের মহানায়ক: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

কেউ কেউ ইতিহাসে স্থান করে নেন; আবার কেউ এমনভাবে একটি জাতির জীবনে আবির্ভূত হন, যাঁকে বাদ দিয়ে সেই জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিই লেখা যায়…

অস্ট্রেলিয়ার বাড়ি নিয়ে দ্বন্দ্ব, ভাঙল ফারুকী-তিশার সংসার?

শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সংসারে ভাঙনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় তিশার নামে থাকা একটি বাড়ি বিক্রি…

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও তারেকের ভারত সফর কি একই সূত্রে গাঁথা?

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর দাবি এবং বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক নতুন করে জটিল হয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au