আসন্ন বড় খাদ্য সংকটের জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ব বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধ, জ্বালানি ও সার সরবরাহে চাপ,…
OTN বাংলা, সিডনি: অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে উৎসবমুখর, ভক্তিময় ও আবেগঘন পরিবেশে দশমবারের মতো মহালয়া উদ্যাপন করেছে বাংলাদেশ পূজা অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)। ৪ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার সিডনির রোজলিয়া কমিউনিটি সেন্টার, ৬৪৫–৬৭১ পেন্যান্ট হিলস রোড, বিক্রফট, নিউ সাউথ ওয়েলস-এ এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাঙালির উপস্থিতিতে মহালয়ার এই আয়োজন পরিণত হয় ধর্মীয় আবহ, বাঙালি সংস্কৃতি এবং প্রবাসী জীবনের এক আন্তরিক মিলনমেলায়।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা বাঙালির মনে যে বিশেষ আবেগ সৃষ্টি করে, তারই প্রতিফলন দেখা যায় পুরো আয়োজনে। চণ্ডীপাঠ, সংগীত ও মঞ্চ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় মহালয়ার চিরায়ত আবহ। প্রবাসের মাটিতে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পরিচিত করে তোলাও ছিল এ আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ পূজা অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি মহালয়ার ইতিহাস ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সংক্ষেপে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি স্মৃতিচারণ করেন সিডনিতে বিপিএ-র মহালয়া উদ্যাপনের শুরুর দিনগুলোর কথা। দশ বছর আগে কীভাবে বাংলাদেশ পূজা অ্যাসোসিয়েশন এই আয়োজন শুরু করেছিল, কীভাবে সীমিত পরিসরের সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে প্রবাসী বাঙালিদের অন্যতম পরিচিত শারদীয় আয়োজনে পরিণত হয়েছে, তিনি তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ পূজা অ্যাসোসিয়েশনের মহালয়া আয়োজনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। সংগঠনটির প্রথম মহালয়া অনুষ্ঠিত হয় সিডনির Kogarah School of Arts, Kogarah-এ। সেই সূচনার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে মহালয়া আয়োজন করে আসছে বিপিএ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিসর যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রবাসী বাঙালি সমাজে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিপিএ তার দশম মহালয়া উদ্যাপনের মাইলফলক স্পর্শ করল।
এবারের মহালয়া মঞ্চায়ন পরিচালিত হয় সুমিতা দে ও অনুপম গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে। তাঁদের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় সংগীত, আবৃত্তিময় উপস্থাপনা এবং মঞ্চের বিভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের আগমনী আবহ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল শরতের আবাহন, দেবীর আগমন এবং শুভশক্তির জাগরণের প্রতীকী প্রকাশ।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল চণ্ডীপাঠ। জ্যোতি বিশ্বাস তাঁর কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ পরিবেশন করেন এবং জন্মেজয় রায় তবলায় সহযোগিতা করেন। চণ্ডীপাঠের ধ্বনি ও তবলার ছন্দ মিলিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে সৃষ্টি হয় এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ। সংগীত ও মঞ্চায়নের সঙ্গে এর সমন্বয় উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের যেন কিছু সময়ের জন্য বাংলার চিরচেনা শারদীয় পরিবেশে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
মহালয়া বাঙালির কাছে কেবল একটি ধর্মীয় উপলক্ষ নয়, এটি শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস, ভোরের চণ্ডীপাঠ এবং আগমনী গানের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জড়িয়ে আছে বাঙালির অসংখ্য স্মৃতি। দেশের বাইরে বসবাসরত বাঙালিদের কাছে তাই মহালয়ার আবেদন আরও বিশেষ। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও এই আয়োজন তাঁদের শিকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
সিডনিতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের কাছেও এ ধরনের আয়োজনের গুরুত্ব রয়েছে। পরিবার ও কমিউনিটির সঙ্গে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তারা বাংলা ভাষা, সংগীত, ধর্মীয় আচার এবং বাঙালির উৎসবের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে মহালয়া উদ্যাপন শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতি ও পরিচয় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
রবিবারের এই আয়োজনে সিডনির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কমিউনিটির সদস্যদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। দীর্ঘদিন পর পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আসন্ন দুর্গোৎসবকে ঘিরে আনন্দ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে এক সামাজিক মিলনক্ষেত্রও। ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি সেখানে ছিল সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব এবং কমিউনিটির পারস্পরিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রত্যয়।
দশম মহালয়া উদ্যাপন হওয়ায় এবারের আয়োজন বিপিএ-র জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এক দশক আগে শুরু হওয়া একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উদ্যোগ যে প্রবাসের মাটিতে ধারাবাহিকতা ধরে রেখে একটি প্রতিষ্ঠিত আয়োজনে পরিণত হতে পারে, এবারের মহালয়া ছিল তারই একটি প্রতিফলন। এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে সংগঠনের বিভিন্ন সময়ের কার্যনির্বাহী কমিটি, শিল্পী, কলাকুশলী, স্বেচ্ছাসেবক, সদস্য এবং শুভানুধ্যায়ীদের অবদান রয়েছে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ পূজা অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি দিবাকর সমদ্দার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা, শিল্পী, চণ্ডীপাঠ ও সংগীত পরিবেশনায় যুক্ত ব্যক্তিবর্গ, অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক এবং আয়োজন সফল করতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতাকারী সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, একটি কমিউনিটি আয়োজনের সাফল্যের পেছনে অনেক মানুষের সময়, শ্রম ও আন্তরিক সহযোগিতা জড়িয়ে থাকে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই বিপিএ-র দশম মহালয়া আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
চণ্ডীপাঠ, আগমনী আবহ এবং প্রবাসী বাঙালিদের প্রাণবন্ত উপস্থিতির মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের মহালয়া আয়োজন। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত অনেকেই সঙ্গে নিয়ে ফেরেন শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী আনন্দ এবং বাংলার চিরচেনা শরতের স্মৃতি।
বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিপিএ-র এই আয়োজন যেন আরেকবার মনে করিয়ে দিল, ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সম্মিলিত উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে সেই শিকড় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে।
দশম মহালয়ার এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পূজা অ্যাসোসিয়েশন স্বাগত জানাল আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবকে, আর প্রবাসী বাঙালিদের মনে ছড়িয়ে দিল দেবীপক্ষের আগমনী বার্তা।
OTN বাংলা | সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au