বিশ্ব

ফ্রান্সে জেন-জি আন্দোলন, শিক্ষা সংকটে রাজপথে শিক্ষার্থীরা

  • 12:35 pm - October 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৫৯ বার
‘জেন জি আন্দোলন’ ছড়াচ্ছে বিশ্বে, ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ।ছবি : রয়টার্স

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে একের পর এক বিক্ষোভের পর এবার ফ্রান্সেও ছড়িয়ে পড়েছে তথাকথিত ‘জেন-জি আন্দোলন’। দেশটির উচ্চবিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক ও সহায়ক কর্মীর সংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, পর্যাপ্ত অর্থ ও শিক্ষা উপকরণের অভাব, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের লিসে সাঁ-একজুপেরি স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। শিক্ষক সংকট ও স্কুলে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে শুরু হওয়া কর্মসূচি কয়েক দিনের মধ্যেই প্যারিসসহ ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে রেন, নান্তেস, কিম্পার, ব্রেস্ট, বোর্দো, তুলুজ, তুলোঁ, মার্সেই, গ্রেনোবল, স্ট্রাসবুর্গ ও লিলসহ দেশের বিভিন্ন শহরের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের শুরুতে প্রায় ১৮০টি স্কুলের কার্যক্রম ব্যাহত হলেও সপ্তাহের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। গত ১৮ দিনে অন্তত ২৪টি স্কুল ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। মার্সেইয়ের দুটি স্কুলে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ সময় একটি দমকলের গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

আন্দোলন ঘিরে ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর প্রায় ৫ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। পাশাপাশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, স্কুলকর্মী ও পুলিশ সদস্যসহ অনেকেই আহত হয়েছেন।

কেন বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা?

ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ শিক্ষক ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতি। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১০ শতাংশ ক্লাস নিয়মিত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ক্লাস বন্ধ ছিল বিকল্প শিক্ষক না পাওয়ার কারণে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত অর্থ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও অবকাঠামো নেই। কোথাও পর্যাপ্ত ডেস্ক-চেয়ার নেই, কোথাও নার্স ও তত্ত্বাবধায়কের ঘাটতি রয়েছে। অনেক পুরোনো ভবনে পানি চুইয়ে পড়ে এবং গরমের সময় শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

প্যারিসের উপশহর পান্তিনের ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, একটি শ্রেণিতে প্রায় ৩৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত চেয়ার নেই। স্ট্রাসবুর্গের ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী জানান, অতিরিক্ত গরম ও শিক্ষার্থীর ভিড়ে শ্রেণিকক্ষে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই এবং কিছু ভবনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেখানে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করা কঠিন।

শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্কুলগুলোর বাজেট ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। তীব্র গরমের সময় শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন হলেও শিক্ষা পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা ‘পারকুরসাপ’ নিয়েও অনেক শিক্ষার্থীর অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থা ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও চাপপূর্ণ করে তুলেছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা কমিয়েছে।

তবে পুরো ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো এক নয়। কোনো অঞ্চলে শিক্ষক ও কর্মী সংকট প্রধান সমস্যা, কোথাও স্কুলের অবকাঠামো ও অর্থের ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। আবার কোথাও তীব্র গরমের মধ্যে পড়াশোনার পরিবেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বিক্ষোভ হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেছেন, আন্দোলনের মূল কারণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ বিক্ষোভকারীদের কোনো একক জাতীয় দাবি নেই। তার মতে, বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় সমস্যা থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে এবং অঞ্চলভেদে শিক্ষার্থীদের দাবিও আলাদা।

ফ্রান্স ছাড়িয়ে ‘জেন-জি’ আন্দোলন

ফ্রান্সের এই আন্দোলনকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক তরুণদের বিক্ষোভের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে বড় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। একই বছর কেনিয়ায় কর বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি ব্যয়ের প্রতিবাদে তরুণরা রাজপথে নামে।

২০২৫ ও ২০২৬ সালে তিউনেশিয়ায় বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল সরকারি সেবা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। সার্বিয়ায় রেলস্টেশনের ছাদ ধসে প্রাণহানির পর দুর্নীতি ও সরকারি অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে।

নেপালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে তরুণদের বিক্ষোভ হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় কর বৃদ্ধি, সরকারি কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। মাদাগাস্কারে বিদ্যুৎ ও পানি সংকট এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে তরুণরা রাজপথে নামে। মরক্কোয় বেকারত্ব, দুর্বল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে।

তুরস্কে নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তরুণদের আন্দোলন দেখা গেছে। পেরু ও মেক্সিকোয় অপরাধ, দুর্নীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ভারতেও শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তরুণরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে নেমেছে।

দেশভেদে এসব আন্দোলনের দাবিতে পার্থক্য থাকলেও দুর্নীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক আন্দোলনের সাধারণ বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তরুণদের এসব কর্মসূচি দ্রুত ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে সরকারের তৎপরতা

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া এসেছে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবির বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়ার জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর কথাও জানিয়েছেন তিনি।

তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সরকার এখনো তাদের সমস্যার সমাধানে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। তাই আগামী সপ্তাহেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দুটি ছাত্র সংগঠন। বাজেট কমানো, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধের মতো সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।

বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন বলেছেন, যেসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সম্পত্তির ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের অভিভাবকদের ক্ষতিপূরণের দায় নিতে হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রীও অভিভাবকদের সন্তানদের সহিংস বিক্ষোভ থেকে দূরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্দোলন তীব্র হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু জরুরি বৈঠক ডাকেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকজন মন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত সফরও বাতিল করা হয়।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছেন, তরুণদের উদ্বেগ ও ক্ষোভের বিষয়টি তিনি বুঝতে পারছেন। তবে তাদের উদ্বেগ বা ক্ষোভ কোনোভাবেই সহিংসতার কারণ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ফলে শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা থেকে শুরু হওয়া ফ্রান্সের এই শিক্ষার্থী আন্দোলন এখন শুধু স্কুলের অবকাঠামো বা শিক্ষক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি বাজেট, শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, তরুণদের সুযোগ এবং দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ। আগামী দিনগুলোতে সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে।

সুত্রঃ ডন

এই শাখার আরও খবর

মেসির বিদায়ে নেইমারের আবেগঘন বার্তা

লিওনেল মেসির সঙ্গে নেইমার জুনিয়রের সম্পর্কটা শুধু মাঠের সতীর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের বন্ধুত্বও ফুটবলবিশ্বে বেশ আলোচিত। বার্সেলোনায় একসঙ্গে খেলার সময় গড়ে উঠেছিল তাদের দারুণ…

রাজনীতি থেকে সংসার, রহস্যমানবী বাঁধনকে নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সরব উপস্থিতির কারণে প্রায়ই আলোচনায় থাকেন তিনি। কথিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়…

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল দেশ, কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি

ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষক, অভিভাবক ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের…

আর্জেন্টিনার জয়, গোল-অ্যাসিস্টে বিদায় রাঙালেন মেসি

জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচটাও স্মরণীয় করে রাখলেন লিওনেল মেসি। বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে জয় দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় শেষ করেছে…

অভিবাসন কমানোর পরিকল্পনায় প্রবীণসেবা কর্মীরাও ঝুঁকিতে

অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী জোটের প্রস্তাবিত অভিবাসন কমানোর পরিকল্পনায় দেশটির প্রবীণসেবা খাতে কর্মরত কিছু কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে স্বীকার করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর। একই সঙ্গে…

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন কমাতে তিন দলের তিন পরিকল্পনা

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতি নিয়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি, বিরোধী লিবারেল-ন্যাশনাল জোট এবং ওয়ান নেশন পার্টির মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। তিন দলই বর্তমানের তুলনায় অভিবাসন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au