প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতে যা যা ঘটছে
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভ সমাবেশে অভিযান চালিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বেশ কয়েকজন বিরোধী আইনপ্রণেতাকে আটক করেছে দিল্লি…
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিরোধী জোটের দীর্ঘ প্রায় ৯ ঘণ্টার বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির পর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রসহ বিরোধী জোটের একাধিক নেতাকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
মঙ্গলবার রাতে দিল্লির আকাশবাণী ভবনের সামনে থেকে তাঁদের একটি বাসে তুলে উত্তর দিল্লির কিংসওয়ে ক্যাম্প পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আটকের সময় রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে পুলিশ জোর করে সরিয়ে নেওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, কংগ্রেস কর্মীরা পুলিশকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পরে পুলিশ সদস্যরা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে ধরে টেনেহিঁচড়ে বাসের দিকে নিয়ে যান।
এই বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোট। নির্বাচন কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে কর্মসূচিটি পালন করা হয়।
আকাশবাণী ভবনের আঙিনায় অনুষ্ঠিত অবস্থান কর্মসূচিতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সমর্থক অংশ নেন।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন একতরফাভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে।
তাদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের উদ্বেগ জানাতে এবং কমিশনের সঙ্গে আলোচনার দাবি জানিয়ে আসছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
এই দাবিতেই মঙ্গলবার দিল্লিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে ইন্ডিয়া জোট।
দুপুরেও আটক করা হয়েছিল রাহুল-প্রিয়াঙ্কাকে
মঙ্গলবার দুপুরেও রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকে সাময়িকভাবে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে তাঁদের পুলিশি একটি বাসে তোলা হয়। তবে কিছুক্ষণ পর তাঁদের বাস থেকে নেমে আসতে দেখা যায়।
সে সময় আকাশবাণী ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাহুল গান্ধী।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় মাত্র ৫০ মিটার দূরে হলেও তাঁদের সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
রাহুল গান্ধী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ভবন মাত্র ৫০ মিটার দূরে, কিন্তু আমাদের সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আমি বুঝতে পারছি না সমস্যাটা কোথায়। নির্বাচন কমিশনের কাজ হলো সঠিকভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা।’
তিনি আরও বলেন, অন্তত ৩০০ জন সংসদ সদস্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করতে চান। কিন্তু তিনি তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে ভয় পাচ্ছেন।
রাহুল প্রশ্ন করেন, ‘জনপ্রতিনিধিরা যদি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখাই করতে না পারেন, তবে গণতন্ত্রের অর্থ কী?’
৩০০ এমপিকে নিয়ে বৈঠকের দাবি
বিরোধীদের পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সময় চেয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কংগ্রেস।
দলটির একটি সূত্রের দাবি, নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্মকর্তা যদি আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যে বৈঠকের আশ্বাস দেন, তাহলে রাহুল গান্ধী চলমান অবস্থান কর্মসূচি তুলে নিতে পারেন।
তবে এ ক্ষেত্রে রাহুলের শর্ত ছিল, বৈঠকে বিরোধী জোটের প্রায় ৩০০ জন সংসদ সদস্যকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
বিরোধীদের বক্তব্য, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের অভিযোগ সরাসরি নির্বাচন কমিশনের সামনে তুলে ধরতেই এতসংখ্যক সংসদ সদস্য একসঙ্গে বৈঠকে অংশ নিতে চান।
নির্বাচন কমিশনের পাল্টা বক্তব্য
বিরোধীদের অভিযোগের পর মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
কমিশন বলেছে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে বৈঠকের জন্য আবেদন করতে হয়। এরপর কমিশন সময় নির্ধারণ করে এবং সম্মত নির্ধারিত সময়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন কমিশনের দাবি, মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ তারা পায়নি।
কমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়, বিকেল ৪টার পর সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বৈঠক নিয়ে নির্বাচন কমিশন বিবেচনা করছিল। ওই সময় দিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) কমিশনকে জানান, প্রস্তাবিত বৈঠকে ২৪০ জন সংসদ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেবে এবং পার্লামেন্ট হাউস অ্যানেক্সে বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন এই প্রস্তাবকে ‘অস্বাভাবিক এবং অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছে।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচলিত প্রোটোকল অনুসারে এ ধরনের বৈঠক নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের ভেতরেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে সংসদ ভবনের অ্যানেক্সে বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব তারা গ্রহণ করেনি।
অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের দাবিতে সকাল থেকেই আকাশবাণী ভবন এলাকায় জড়ো হতে থাকেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভিড় বাড়তে থাকে।
রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বিরোধী নেতারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে নিজেদের আপত্তি তুলে ধরেন। দীর্ঘ সময় অবস্থান কর্মসূচি চলার পর রাতে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
একপর্যায়ে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে পুলিশ আটক করে বাসে তুলে নেয়। পরে তাঁদের উত্তর দিল্লির কিংসওয়ে ক্যাম্প পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই আটকের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিরোধীদের চলমান রাজনৈতিক চাপ আরও তীব্র হলো। একদিকে বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে কমিশন বলছে, নির্ধারিত নিয়ম ও প্রোটোকল অনুসারেই তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে।
ফলে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠক শেষ পর্যন্ত কবে এবং কীভাবে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au