মেসির বিদায়ে নেইমারের আবেগঘন বার্তা
লিওনেল মেসির সঙ্গে নেইমার জুনিয়রের সম্পর্কটা শুধু মাঠের সতীর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের বন্ধুত্বও ফুটবলবিশ্বে বেশ আলোচিত। বার্সেলোনায় একসঙ্গে খেলার সময় গড়ে উঠেছিল তাদের দারুণ…
ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষক, অভিভাবক ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে শত শত মানুষ আহত হয়েছেন এবং কয়েক শ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু পরিস্থিতিকে কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে গুরুতর আঘাতগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশটির কয়েক ডজন শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। প্যারিস, স্ত্রাসবুর, রেন ও তুলুজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও কয়েকটি এলাকায় পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
ফরাসি সংসদে লেকর্নু জানিয়েছেন, সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের সহিংসতায় ৭০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য আহত হন। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এদিন ৪৮ জন নিরাপত্তাকর্মী আহত এবং ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্যারিসে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানো প্রায় ৩০০ জনের অধিকাংশই মুখ ঢাকা বা মুখোশ পরা ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। রাজধানীর বাইরে অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি এলাকায় দোকান ও বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এর আগে সোমবারের সংঘর্ষে এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
সেপ্টেম্বরে প্যারিসের দরিদ্র উপশহরগুলোতে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে তা ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক সংকট, পর্যাপ্ত অর্থের অভাব এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামো রয়েছে। কোনো কোনো স্কুলে ভবনের ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ছে, আবার কোথাও ইঁদুরের উপদ্রবের মতো মৌলিক সমস্যাও রয়েছে।
উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির অর্ধেকের বেশি উচ্চবিদ্যালয় অবরুদ্ধ ছিল অথবা বন্ধ রাখতে হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে পাঠদানের ব্যবস্থাও করা হয়।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ স্কুল সময় পুনর্বিবেচনা, মধ্যাহ্নভোজের বিরতি বাড়ানো এবং পুরোনো ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার করা। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে আরও সরকারি বিনিয়োগেরও দাবি জানাচ্ছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জরুরি বৈঠক ডাকেন। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু ও সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকের পর লেকর্নু মন্ত্রীদের শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন এবং অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রাথমিক প্রস্তাব তৈরির সময়সীমা দেন।
তবে সরকারের এসব উদ্যোগে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সন্তোষ দেখা যায়নি। প্যারিসের একটি স্কুলের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অভিভাবক এমিলি লোম বলেন, সরকারের বক্তব্যে বাস্তবে তাদের সন্তানদের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সংগঠনগুলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। সরকার অবশ্য বলছে, কিছু বহিরাগত ব্যক্তি আন্দোলনটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে এবং কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ নগর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন অভিযোগে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। ফলে বিক্ষোভ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ওপরও চাপ বাড়ছে।
অর্থনৈতিক সংকটও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এবং বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মধ্যে শিক্ষা খাতে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার সাময়িকভাবে ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের ওপরে উঠে যায়।
একই সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে ফ্রান্সের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক শিক্ষাগত পারফরম্যান্সে ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভকে অভিবাসন ও ইসলাম প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসনের’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূল দাবিগুলো শিক্ষা খাতে অর্থ, শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফ্রান্সে আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে দেশটির রাজনীতিতে ডান ও বাম উভয় ধারার জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর সমর্থন বাড়ছে। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই শিক্ষার্থীদের দেশব্যাপী আন্দোলন সরকারকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au