দিনাজপুরে ধানক্ষেতে হিন্দু কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নিখোঁজের সাত দিন পর ধানক্ষেত থেকে প্রশান্ত রায় (১৭) নামে এক হিন্দু কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, প্রশান্তকে হত্যা করে মরদেহ ধানক্ষেতে ফেলে রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত ও পুলিশি তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের সেনপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত প্রশান্ত রায় একই ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের রমেশ চন্দ্র রায়ের ছেলে।
পরিবার ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর প্রশান্ত আর বাড়িতে ফেরেনি। সন্ধ্যার পর তার ফেরার অপেক্ষায় থাকলেও রাত পেরিয়ে গেলেও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এরপর আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজনসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজের পর থেকে সাত দিন ধরে প্রশান্তের পরিবারের সদস্যরা তার সন্ধানে ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নেওয়া হলেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এর মধ্যেই বুধবার দুপুরে পার্শ্ববর্তী একটি ধানক্ষেতে গরুর জন্য ঘাস কাটতে যান সাবিত্রী নামে স্থানীয় এক নারী। এ সময় তিনি ধানক্ষেতের মধ্যে একটি অর্ধগলিত মরদেহ দেখতে পান। পরে বিষয়টি আশপাশের লোকজনকে জানালে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য যতীন্দ্রনাথ বিষয়টি বীরগঞ্জ থানা পুলিশকে জানান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান প্রশান্তের পরিবারের সদস্যরা। মরদেহ দেখে তারা প্রশান্তকে শনাক্ত করেন বলে জানা গেছে।
প্রশান্তের বাবা রমেশ চন্দ্র রায় বলেন, তার ছেলে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় তাকে খুঁজেছেন। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। বুধবার পাশের ধানক্ষেতে অর্ধগলিত অবস্থায় ছেলের মরদেহ পাওয়া যায়।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রশান্তকে হত্যার পর মরদেহ ধানক্ষেতে ফেলে রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে বা কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয় হিন্দু পরিবারের নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন। বিশেষ করে একজন কিশোর সাত দিন নিখোঁজ থাকার পর জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি একটি ধানক্ষেত থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
তবে প্রশান্তের মৃত্যুর সঙ্গে তার হিন্দু পরিচয় বা কোনো সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের সম্পর্ক রয়েছে কি না, এ মুহূর্তে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটিকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করার আগে তদন্তের ফলাফল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে যদি হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায় এবং এর পেছনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হামলার কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের গুরুতর ঘটনায় পরিণত হতে পারে।
বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় জিডির ভিত্তিতে থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। প্রশান্তের মৃত্যুর কারণ জানতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
এখন তদন্তের মূল বিষয়গুলো হলো, প্রশান্ত বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল, কীভাবে সে নিখোঁজ হলো এবং শেষ পর্যন্ত তার মরদেহ ধানক্ষেতে কীভাবে পৌঁছাল। পাশাপাশি মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, মৃত্যুর আগে বা পরে তাকে অন্য কোথাও রাখা হয়েছিল কি না এবং তার মৃত্যুর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেসবও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং পুলিশের তদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন নিহতের পরিবার। প্রশান্তের পরিবারের দাবি, বিষয়টি কোনোভাবেই যেন সাধারণ নিখোঁজ বা স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া না হয়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।