বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে (মোফা) প্রেষণে পাঠানোর কথা জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন বঙ্গভবন ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে (মোফা) প্রেষণে পাঠানোর কথা জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন বঙ্গভবন ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দুই দেশ সফরে থাকা সেনাপ্রধানকে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের একজন শীর্ষ সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ টেলিফোনে এ বিষয়ে অবহিত করেন বলে সূত্রগুলোর দাবি। তবে সেনাপ্রধানকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল বলে গত দুই দিনে বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য ছড়িয়েছিল, তার বেশির ভাগই সঠিক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর বিষয়ে ওই বার্তা ঢাকার সেনানিবাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেনাপ্রধানের হাতেই সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় প্রধানমন্ত্রীর অধীন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ (এএফডি) বিষয়টি নিয়ে আর চাপ দেয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
২০২৪ সালের ২৪ জুন সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। একই বছরের আগস্টের শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার মধ্যে মতবিরোধ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনাপ্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলাম এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কর্তৃত্ব ও সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামো নিয়ে আগে থেকেই মতবিরোধ চলছিল।
এর প্রথম প্রকাশ ঘটে ঢাকায় ও এর আশপাশে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইউনিটে কর্মরত সেনা কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সেনাসদর থেকে জারি করা দুটি আদেশ ঘিরে সেনাপ্রধানের কর্তৃত্ব ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব আদেশের মাধ্যমে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সামরিক ফরমেশনের কমান্ড কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়। এতে সেনাপ্রধানের পরিচালনাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর ও প্রভাব ধীরে ধীরে সীমিত করার চেষ্টা চলছে বলে কোনো কোনো মহলে ধারণা তৈরি হয়।
তবে ৮ সেপ্টেম্বরের আদেশগুলোতে সরাসরি কাউকে এসব বদলি ও পদায়নের পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, সেনাপ্রধানকে না জানিয়েই এসব বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্ণ সমর্থন ছিল বলেও সূত্রগুলো দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
৪৬তম স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড নিয়ে বিরোধ
৮ সেপ্টেম্বরের আদেশগুলোর মধ্যে ঢাকাভিত্তিক ৪৬তম স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার নিয়োগ নিয়ে বিরোধটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক আদেশে সেনাসদরের সামরিক প্রশিক্ষণ পরিদপ্তরে কর্মরত ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরকে ব্রিগেডটির কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে সেনাপ্রধানের আপত্তির পর ২০ সেপ্টেম্বর ওই আদেশ সংশোধন করা হয়। নতুন আদেশে ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ আশিকুর রহমানকে কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৬তম স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড সরাসরি সেনাসদরের অধীন। ফলে এর কমান্ডারের দায়িত্ব কেবল ব্রিগেডের নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়। সেনাসদর এবং ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় সামরিক কার্যক্রমের সমন্বয়েও এ পদ গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ব্রিগেডের কমান্ডার পরিবর্তনের ফলে সেনাসদরকে ঘিরে তাৎক্ষণিক সামরিক সমন্বয় ও কমান্ড কাঠামোয় প্রভাব পড়তে পারে।
বিমান প্রতিরক্ষা ব্রিগেডেও পরিবর্তন
ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত ষষ্ঠ স্বতন্ত্র বিমান প্রতিরক্ষা ব্রিগেডের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়।
প্রাথমিক আদেশ অনুযায়ী, ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ রফিকুল হাসানকে ওই ব্রিগেড থেকে সরিয়ে অস্থায়ী সেনা বিমান প্রতিরক্ষা কেন্দ্র ও স্কুলের কমান্ড্যান্ট করা হয়। একই সঙ্গে তাঁকে ৩৩তম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তরের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা হয়।
অন্যদিকে, ৩৩তম পদাতিক ডিভিশনের অধীন বিমান প্রতিরক্ষা কেন্দ্র ও স্কুলের সঙ্গে সংযুক্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিএইচএম সেলিম হাসানকে ষষ্ঠ স্বতন্ত্র বিমান প্রতিরক্ষা ব্রিগেডের কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ পরিবর্তনের ফলে মিরপুরের গুরুত্বপূর্ণ বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কার্যত অদলবদল ঘটে। এতে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদায়নেও রদবদল
৮ সেপ্টেম্বরের আদেশে মেজর জেনারেল পদমর্যাদার একাধিক কর্মকর্তার দায়িত্বেও পরিবর্তন আনা হয়।
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানকে সেনাসদরের সামরিক সচিব শাখা থেকে জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজে সিনিয়র ডিরেক্টিং স্টাফ (আর্মি) হিসেবে পদায়ন করা হয়। অন্যদিকে, জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজে কর্মরত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ খায়ের উদ্দিনকে সেনাসদরের সামরিক সচিব শাখায় পাঠানো হয়।
৩৩তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি পদেও পরিবর্তন আনা হয়। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ নাজিম-উদ-দৌলাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টারের (বিআইআরসি) কমান্ড্যান্ট করা হয়।
একই আদেশে সেনাসদরের ইনফ্যান্ট্রি পরিদপ্তরে কর্মরত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মোস্তাসিম হায়দার চৌধুরীকে ৩৩তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়।
এ ছাড়া বিআইআরসিতে কর্মরত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আফতাব হোসেনকে ১৭তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করা হয়। ৩৩তম পদাতিক ডিভিশনের আগের জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলীমুল আমিনের নতুন দায়িত্ব পরে জানানো হবে বলে আদেশে উল্লেখ ছিল।
ঢাকায় অবস্থিত ১৪তম স্বতন্ত্র ইঞ্জিনিয়ার্স ব্রিগেড ও ৮৬তম স্বতন্ত্র সিগন্যালস ব্রিগেডের কমান্ডারদের অবস্থান নিয়েও প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, ১৪তম ইঞ্জিনিয়ার্স ব্রিগেডের নেতৃত্বে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ ফজলে গাউস এবং ৮৬তম সিগন্যালস ব্রিগেডের নেতৃত্বে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান। তবে ৮ সেপ্টেম্বরের আদেশে এই দুই ব্রিগেডের কমান্ডারদের বদলির কোনো তথ্য নেই।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৬ এপ্রিল সরকার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল ইসলামকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দায়িত্বও দেয় এবং তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা প্রদান করে।
তবে ৮ সেপ্টেম্বরের বদলি ও পদায়নের আদেশগুলোতে তাঁর নাম নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব আদেশের আনুষ্ঠানিক ভাষা অনুযায়ী নিয়োগ ও পদায়নগুলো সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নামে জারি করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে পাঠানো সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের চারটি চিঠির উল্লেখও আদেশগুলোতে ছিল।
এসব নথি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সম্পৃক্ততা তুলে ধরে। তবে পরিবর্তনগুলোর মূল পরিকল্পনাকারী কে ছিলেন, তা নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
সেনাবাহিনীর কয়েকটি সূত্রের দাবি, ঢাকাভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইউনিটে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং বিভিন্ন ফিল্ড কমান্ডের সঙ্গে সেনাসদরের সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের ফলে সেনাপ্রধানের কিছু পরিচালনাগত ও কমান্ড-সংক্রান্ত প্রভাব কমে যায়। তবে ৮ সেপ্টেম্বরের আদেশগুলোতে এ ধরনের উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে আদেশগুলোকে নিয়মিত সামরিক বদলি ও পদায়ন হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে আরও সরাসরি হস্তক্ষেপের ঘটনা হতো।
সফরে সক্রিয় সেনাপ্রধান
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনাপ্রধানের দায়িত্বে বহাল ছিলেন। ৫ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার পার্থে তিনি দেশটির সেনাপ্রধান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জোয়েল ভাওয়েলের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ এখনও ওয়াকার-উজ-জামানের হাতেই রয়েছে।
প্রতিবেদনে উত্থাপিত তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে সেনাপ্রধানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ, সামরিক বদলি-পদায়ন ঘিরে মতবিরোধ এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সূত্র: নর্থইস্ট নিউজ