ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আগেই জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং আরও কয়েকজন নেতাকেও আটক করা হয়েছে। বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে গুরুগ্রামে নিজের বাসা থেকে ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মিড-ডে ও দ্য হিন্দু। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লি ও গুরুগ্রাম পুলিশের যৌথ অভিযানে গুরুগ্রামের একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে অজ্ঞাত একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে। তবে তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে এবং আটকের পর তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেকেও আটক করেছে দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখা। শনিবার মহারাষ্ট্র থেকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বিমানটির ভেতর থেকেই তাঁকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।
শুধু অভিজিৎ দিপকে নন, দলটির আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকেও আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। দিল্লিতে পৌঁছানোর পরপরই তাঁদের আটক করা হয় বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু।
শনিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি ও কয়েকটি বামপন্থী সংগঠন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন।
তবে দিল্লি পুলিশ আগেই এই বিক্ষোভের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক শর্ত এবং আগের দেওয়া প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের বিষয়টি উল্লেখ করে কর্মসূচির অনুমতি বাতিল করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও শনিবার সকাল থেকে যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁদের আটক করে বাসে তুলে নিয়ে যায়।
মিড-ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার দুপুর পর্যন্ত নয়াদিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। তবে আটকের সংখ্যা ও সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে পার্থক্য রয়েছে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীতে প্রায় সাত হাজার মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি কার্যালয় ও বিক্ষোভস্থলের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং পেশাদারত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ রাখা হয়েছে। দিল্লিগামী বেশ কিছু ট্রেনও বাতিল করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের কারণে সাধারণ যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিক্ষোভকারীদের দিল্লির দিকে যাত্রা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরের পরিবর্তে রামলীলা ময়দানে বিক্ষোভ আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে সেখানে কর্মসূচি পালনের অনুমতি চেয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ককরোচ জনতা পার্টি ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া সংগঠনগুলো আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
এদিকে জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এবং ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতাসহ একাধিক নেতাকে আটকের ঘটনায় ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার, পুলিশের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এর আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে দিল্লিতে চলাচলের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞাকে অতিরিক্ত কঠোর বলে মন্তব্য করেছিলেন বলে দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দিল্লি পুলিশ বলছে, রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভের মূল আয়োজকসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের আটকের পরও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে দিল্লির যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় পরিস্থিতি ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: মিড-ডে, দ্য হিন্দু ।