সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা নিয়ে আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে শুভ মহালয়া। এর মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে পিতৃপক্ষ, আর শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষের পুণ্যলগ্ন। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়া হলো দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের আহ্বান জানানোর বিশেষ দিন। এই দিন থেকেই শুরু হয় বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক ক্ষণগণনা।
প্রকাশিত পঞ্জিকা অনুযায়ী, চলতি বছর মহালয়া পালিত হচ্ছে ১০ অক্টোবর। আর শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে আগামী ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে। এরপর পর্যায়ক্রমে মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২১ অক্টোবর, বুধবার বিজয়াদশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব।
মহালয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন দেবী দুর্গার আবাহনের পাশাপাশি প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। শ্রাদ্ধ, তর্পণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভক্তরা।
পঞ্জিকার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অমাবস্যা তিথি শুরু হয়েছে ৯ অক্টোবর রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে এবং শেষ হবে ১০ অক্টোবর রাত ৯টা ১৯ মিনিটে। এই অমাবস্যাকে সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা মহালয়া অমাবস্যা বলা হয়। পিতৃপক্ষের শেষ দিনে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে জল ও তিল নিবেদনের মাধ্যমে তর্পণ করা হয়। তবে শ্রাদ্ধ ও তর্পণের নির্দিষ্ট সময় অঞ্চলভেদে স্থানীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, মহালয়ার মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আগমনের আহ্বান জানানো হয়। এদিন শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠ এবং মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্রপাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। চণ্ডীতে দেবী দুর্গার সৃষ্টি, তাঁর অসীম শক্তি এবং মহিষাসুরের বিরুদ্ধে বিজয়ের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবেই দেবী দুর্গার আরাধনা করেন ভক্তরা।
এদিকে মহালয়ার পরদিন আগামী ১১ অক্টোবর, রবিবার থেকে শুরু হবে শারদীয় নবরাত্রি। দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপের আরাধনার মধ্য দিয়ে নয় দিনব্যাপী এই ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়। নবরাত্রির আচার-অনুষ্ঠান এবং বাঙালিদের শারদীয় দুর্গাপূজার রীতিনীতির মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও উভয় উৎসবেই দেবীশক্তির বন্দনা করা হয়।
চলতি বছরের দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে। এদিন দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে পূজার সূচনা হবে। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানিয়ে শুরু করা হয় পূজার প্রধান আয়োজন।
এরপর ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমীর আচার-অনুষ্ঠান পালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রকাশিত পঞ্জিকায়। মহাসপ্তমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন নবপত্রিকা স্নান ও পূজা। এই আচারকে দেবী দুর্গার আরাধনার একটি বিশেষ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আগামী ১৯ অক্টোবর, সোমবার অনুষ্ঠিত হবে মহাষ্টমীর পূজা। দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দিনে ভক্তরা দেবী দুর্গার চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করবেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্দিরে কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজার আয়োজন করা হবে। মহাষ্টমীর সন্ধিপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
পরদিন ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে মহানবমীর পূজা। এদিন দেবী দুর্গার বিশেষ আরাধনার পাশাপাশি নবমী হোম ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালন করা হবে। ভক্তরা দেবীর কাছে পরিবার, সমাজ ও দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মঙ্গল কামনা করবেন।
সবশেষে ২১ অক্টোবর, বুধবার বিজয়াদশমীর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। এদিন দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে সিঁদুর খেলা, বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় এবং প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গাপূজার আয়োজন।
বিজয়াদশমী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একদিকে আনন্দের, অন্যদিকে আবেগঘন একটি দিন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক থেকে কৈলাসে ফিরে যান। তাই দেবীকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি আগামী বছর আবারও তাঁর আগমনের প্রত্যাশা করেন ভক্তরা।
এদিকে মহালয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ও উৎসাহ। দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে পূজার প্রস্তুতি। ভক্তদের প্রত্যাশা, দেবী দুর্গার আশীর্বাদে দূর হবে সব অশুভ শক্তি, প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ।
তবে পূজার তিথি ও আচার-অনুষ্ঠানের সময়সূচিতে অঞ্চলভেদে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই নির্দিষ্ট পূজার সময় ও ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে স্থানীয় পঞ্জিকা এবং মন্দির কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস।