এনসিটি ইজারা বাতিলের দাবি, প্রয়োজনে হরতালে যাওয়ার ঘোষণা জোটের
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। একই সঙ্গে সোমবার (১২ অক্টোবর) বন্দর…
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার এবং ভয়াবহ পারমাণবিক সংঘাতের কারণে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ মানবজাতির অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমনকি চরম পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী ল্যানসেটের এক নতুন বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে দৈনিক যুগান্তর।
ল্যানসেটের ‘একবিংশ শতাব্দীতে স্বাস্থ্যের ওপর বৈশ্বিক হুমকি’ বিষয়ক কমিশনের গবেষণায় আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ১৭টি বড় ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকর ব্যবহার, পারমাণবিক যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, শিশু অপুষ্টি এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
গবেষকদের মতে, এসব হুমকি আলাদাভাবে সৃষ্টি হলেও একটির সঙ্গে অন্যটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনো একটি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করলে তা অন্য সংকটগুলোকেও আরও জটিল করে তুলতে পারে। এ কারণে সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জৈব অস্ত্র তৈরি কিংবা পারমাণবিক যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ মানবসভ্যতার জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ ধরনের চরম বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এতটাই ভয়াবহ যে বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
পারমাণবিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপজ্জনক জৈব অস্ত্র তৈরি বা তার বিস্তার সহজ হয়ে উঠলে মানবস্বাস্থ্যের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
ল্যানসেটের প্রতিবেদনের পাশাপাশি প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়তেও বলা হয়েছে, এসব ঘটনা বাস্তবে ঘটলে মানবজাতিকে নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি বিলুপ্ত হবেই, এমন কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি। বরং সম্ভাবনা কম হলেও অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এমন ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে আগাম সতর্ক করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের পরিচালক এবং কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, বর্তমান বিশ্বের নেতারা আজ যেসব সিদ্ধান্ত নেবেন, তার ওপরই আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সুস্থতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
গবেষণায় সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোর প্রভাব মূল্যায়নের জন্য একটি বিশেষ পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এতে অসুস্থতা, অক্ষমতা কিংবা অকালমৃত্যুর কারণে মানুষের কত বছর সুস্থ জীবন হারিয়ে যেতে পারে, তা হিসাব করা হয়েছে। এই পদ্ধতি ‘ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ বা ‘ডালি’ নামে পরিচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক সংঘাত ছাড়াও বায়ুদূষণ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর বিরুদ্ধে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, জলবায়ু বিপর্যয়, যুদ্ধ, শিশু অপুষ্টি এবং বৈদেশিক সহায়তা হ্রাসের মতো বিষয়গুলো মানবস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
এ ছাড়া অতিরিক্ত মদ্যপান, উচ্চ রক্তচাপ, আয়বৈষম্য, শিক্ষার নিম্নহার, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট মহামারি, স্থূলতা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ধূমপান এবং বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্যসমস্যাকেও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষকদের হিসাবে, এসব বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে সম্মিলিতভাবে ১০০ কোটিরও বেশি বছরের সুস্থ জীবন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে গবেষণায়। এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর পরিবর্তে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হলে প্রায় ১৮৯ কোটি বছরের সুস্থ জীবন হারিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যঝুঁকির ধরনেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে স্থূলতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগকে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিপরীতে নিম্ন আয়ের অঞ্চলগুলোতে শিক্ষার নিম্নহার, অপুষ্টি এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি বেশি প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে সাব-সাহারা আফ্রিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। তাঁদের হিসাবে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাটছাঁট কিংবা সহায়তা কার্যক্রম ভেঙে পড়লে ২১০০ সালের আগে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫০ কোটি বছরের সুস্থ জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে সাব-সাহারা আফ্রিকার মানুষ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি বড় দাতা দেশ সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। এর ফলে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের সংক্রামক রোগ মহামারিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম আবুবকর বলেন, এই গবেষণার উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো নয়। বরং সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আগাম ধারণা দেওয়া এবং সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে কত বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব, সেটি তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য।
৩৫ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত কমিশনের গবেষণার ফলাফল রোববার জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, চিহ্নিত ১৭টি হুমকির বিষয়ে নতুন তথ্য এবং ভবিষ্যতে উদ্ভূত ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবছর এই মূল্যায়ন হালনাগাদ করা হবে।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, তিন বছর আগে সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও মহামারিকে প্রধান তিনটি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এই গবেষণার কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, মানবস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক ঝুঁকির সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
তাঁর মতে, এসব বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় সরকারগুলোর এখন থেকেই পর্যাপ্ত অর্থ, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
গবেষকরা বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, সম্ভাব্য বিপর্যয় বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, পারমাণবিক সংঘাত প্রতিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগজনক নানা আশঙ্কা থাকলেও যথাযথ পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এসব ঝুঁকির অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
সূত্র:দ্য গার্ডিয়ান
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au