চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থা টানা ২১ দিনে গড়িয়েছে। নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল ও সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন ও কর্মবিরতিতে স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে সেশনজটের আশঙ্কা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ ও শিক্ষার্থীদের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ কারণে নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল এবং অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের এক দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন তাঁরা।
গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বিক্ষোভ মিছিল, মুখ ও চোখ বেঁধে প্রতিবাদ, প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়া, অবস্থান কর্মসূচি এবং ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, উপাচার্য নিয়োগসংক্রান্ত বিরোধের গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জুলকারনাইন মিহাদ বলেন, তাঁদের এক দফা দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন কর্মসূচি চলবে।
আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থী অর্ণব বলেন, তাঁরা আশা করছেন সরকার দ্রুত বিষয়টির সমাধান করবে। সরকারের প্রতি আস্থা থাকলেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।
এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে কর্মবিরতি পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। চুয়েট শিক্ষক সমিতি জানিয়েছে, উপাচার্য নিয়োগসংক্রান্ত দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, সমিতির দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষকরা তাঁদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করবেন না।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) শিক্ষক সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরি সভায় চলমান পূর্ণ কর্মবিরতি আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকা এবং অবস্থান ধর্মঘট অব্যাহত রাখার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়।
শিক্ষকদের এই অবস্থানের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ও পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সামিউন বাসির জানিয়েছেন, চলমান অচলাবস্থার কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন বর্ষের অন্তত ১৫টি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ১২ কার্যদিবস ক্লাস বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের সেশনজট তৈরি হতে পারে। তাই আর সময় নষ্ট না করে সরকারকে দ্রুত যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক সামিউন বাসির আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করাই তাঁদের দাবি। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নন, আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। তাঁরাও কর্মবিরতি পালন করছেন এবং উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিয়মিত সেবা কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের বেতন ও উৎসব ভাতা নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন উপাচার্যের নির্দেশে সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৮৭ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন এবং উৎসব ভাতা ছাড় সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল।
পরে ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলে সংশ্লিষ্টরা তাঁদের বেতন-ভাতা পান।
চুয়েট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়তোষ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি চলবে।
এদিকে টানা ২১ দিনের অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নিয়মিত ক্লাস, ল্যাব, ব্যবহারিক শিক্ষা ও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে সেমিস্টার শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থীর সেমিস্টার ফাইনাল কিংবা চূড়ান্ত পরীক্ষা সামনে রয়েছে, তাঁদের শিক্ষাজীবন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন পরীক্ষা বন্ধ থাকলে ফল প্রকাশ, পরবর্তী সেমিস্টারে উত্তরণ এবং স্নাতক সম্পন্ন করার সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
এতে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, চাকরির আবেদন এবং পেশাগত প্রস্তুতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী হুমাইরা তাসনিয়া বলেন, চলমান আন্দোলনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় সেশনজটের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।
আরেক শিক্ষার্থী বিধান বড়ুয়া বলেন, অধ্যাপক সায়েমকে দায়িত্ব দেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কেন সরিয়ে দেওয়া হলো, তার ব্যাখ্যা জানতে চান তাঁরা। একই সঙ্গে তাঁকে পুনর্বহালের দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ থাকার পরও সংকটের সমাধান না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান করে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী অর্ণব জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে এখনো শিক্ষার্থীদের সরাসরি যোগাযোগ হয়নি। তবে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বলে তাঁর ধারণা। সরকার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধান করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও আন্দোলনের কারণে তিনি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেননি।
এ পরিস্থিতিতে উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরাফাত রহমানকে দুই দিনের জন্য উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ১১ ও ১২ অক্টোবর তাঁর এই দায়িত্ব পালনের কথা রয়েছে। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এদিকে চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। পরবর্তী সময়ে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সংকট দ্রুত নিরসন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে স্থগিত পরীক্ষাগুলো দ্রুত আয়োজন, নিয়মিত ক্লাস চালু এবং সম্ভাব্য সেশনজট মোকাবিলায় কার্যকর একাডেমিক পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।