মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির অব্যাহত দরপতন ঠেকাতে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে ভারত সরকার ও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছর রুপির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছর মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মূল্য ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। গত মে মাসে প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য দাঁড়ায় ৯৬ দশমিক ৯৬ রুপিতে, যা দেশটির মুদ্রার ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়।
এমন পরিস্থিতিতে রুপির দর স্থিতিশীল রাখতে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে ভারত।
গত শুক্রবার রুপির দরপতন ঠেকাতে নতুন কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করে আরবিআই। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর ডলার কেনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনসংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ১২ অক্টোবর থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি বড় তেল কোম্পানি ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম ও ভারত পেট্রোলিয়ামের দৈনন্দিন ডলারের চাহিদা মেটাতে বিশেষ ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
এই ব্যবস্থার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকে সরাসরি তেল কোম্পানিগুলোকে ডলার সরবরাহ করতে পারবে। ফলে কোম্পানিগুলোকে খোলাবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার কিনতে হবে না। এতে বাজারে ডলারের চাহিদা কমে রুপির ওপর চাপ কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।
ভারত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে ডলারের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। এ কারণে তেল আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে জল্পনামূলক লেনদেন কমাতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে আরবিআই। গত ১০ অক্টোবর ঘোষিত নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি মোকাবিলার চুক্তির বিপরীতে মুদ্রা ব্যবসায়ীদের ২০ শতাংশ অর্থ সংরক্ষণ করতে হবে।
এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি সংরক্ষণ তহবিল হিসেবে রাখা হবে। মূলত বিদেশ থেকে পণ্য ও সেবা কেনার মতো চলতি হিসাবের লেনদেনসংক্রান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে নিয়মটি কার্যকর হবে। তবে বিদেশি শেয়ার বা ঋণে বিনিয়োগের ঝুঁকি মোকাবিলার চুক্তি এর আওতার বাইরে থাকবে।
এ ছাড়া মূল লেনদেনের প্রমাণ ছাড়াই করা যায়, এমন বৈদেশিক মুদ্রার আর্থিক চুক্তির সর্বোচ্চ সীমা ১০ কোটি ডলার থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। বাতিল করা চুক্তি পুনরায় চালুর সুযোগও বন্ধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রুপির দরপতন ঠেকাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত সরকার। গত জুনে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফার ওপর আরোপিত সাড়ে ১২ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে সুদ থেকে পাওয়া আয়ের ওপর ২০ শতাংশ করও বাতিল করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসকেও এসব কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও বেশি ধরনের সরকারি বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আরবিআই।
বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গত জুনে ব্যাংকগুলোকে প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় আমানত সংগ্রহে উৎসাহ দিতে বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই কর্মসূচির মাধ্যমে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে কর্মসূচিটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো যাতে সহজে বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নিতে পারে, সে জন্য বিশেষ সুবিধায় মুদ্রা বিনিময়ের হার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত এই সুবিধা চালু থাকার কথা রয়েছে।
শেয়ারবাজারে প্রবাসী ভারতীয়দের বিনিয়োগ বাড়াতেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসীদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জুন থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে আরবিআই। গত জুনে রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর সময়সীমা ১৫ মাস থেকে কমিয়ে ৯ মাস করা হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যসংক্রান্ত উত্তেজনার কারণে রপ্তানি আয় দেশে ফেরানোর সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে সেই সুবিধা সীমিত করা হয়েছে।
এদিকে ডলারের চাহিদা কমানোর অংশ হিসেবে সোনা ও রুপা আমদানিতেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে ভারত। গত মে মাসে মূল্যবান এই দুই ধাতুর আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়।
নতুন শুল্ক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে ১০ শতাংশ মৌলিক শুল্ক এবং ৫ শতাংশ কৃষি অবকাঠামো ও উন্নয়ন শুল্ক। সরকারের লক্ষ্য, সোনা ও রুপা আমদানির ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণ করা।
একই সঙ্গে গয়না রপ্তানির জন্য শুল্কমুক্ত সোনা আমদানির ক্ষেত্রেও নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি লাইসেন্সের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০০ কেজি সোনা আমদানি করা যাবে।
পাশাপাশি ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধ রুপার বার এবং অন্যান্য আধা-প্রক্রিয়াজাত রুপার পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সাধারণ নাগরিকদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত মে মাসে তিনি অপ্রয়োজনীয় বিদেশভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। তবে বিদেশভ্রমণের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।
জ্বালানি সাশ্রয় এবং ব্যয়বহুল তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজ করারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ব্যাংকগুলোর নির্দিষ্ট ধরনের লেনদেনের সীমা কমিয়ে দেয় আরবিআই। মূলত রুপির দরপতনের চাপ বাড়াতে পারে, এমন লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে, ভারতের এসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে ফেরানো এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রুপির ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহারের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রুপির ওপর চাপ পুরোপুরি কাটানো কঠিন হতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর হয়, তা আগামী দিনের মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
সূত্র: রয়টার্স।