মতামত

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ: ইতিহাস, জনভিত্তি ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার

মতামত: এসএমএফ নবাব সিরাজউদ্দৌলা

  • 10:29 pm - October 12, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৪৩ বার
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ: ইতিহাস, জনভিত্তি ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নাম নয়; দলটির ইতিহাস বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভাষার অধিকার, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সেই কারণে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ শুধু একটি দলের সাংগঠনিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনীতি, একটি বড় রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাতীয় ইতিহাস ও মূল্যবোধের প্রশ্ন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও নিবন্ধন স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও দলটিকে “Bangladesh Awami League (Suspended)” হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলটি অংশ নিতে পারেনি। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করেছে—দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে এবং এর বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ঐতিহাসিক ভোটভিত্তির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত হবে?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক নীতির আলোকে বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি অধ্যায়

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগের জন্ম। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা, এক ব্যক্তি এক ভোট, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের মতো দাবি দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে ছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলটি ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলার প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি সাধারণ জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে এবং সংরক্ষিত নারী আসনসহ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে মোট ১৬৭টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন অভিযান এবং ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে অনিবার্য করে তোলে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন।এই ঐতিহাসিক সত্যের কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগের অবস্থানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কোনো রাজনৈতিক দলের বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক, সমালোচনা বা বিচার থাকতে পারে; কিন্তু ইতিহাসকে বর্তমান রাজনৈতিক বিরোধের ভিত্তিতে পুনর্লিখন করা কোনো জাতির জন্যই সুস্থ প্রবণতা নয়।

আওয়ামী লীগের সামাজিক ভিত্তি শুধু দলীয় সদস্যের সংখ্যায় পরিমাপযোগ্য নয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ দীর্ঘকাল ধরে অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছে। বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনী ফলাফল সেটিই দেখায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল; ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে প্রায় ৩৭.৫ শতাংশ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রায় ৪০.১ শতাংশ ভোট পায়। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ৪৮.২৯ শতাংশ ভোট পায় এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট অর্জন করে। এসব সংখ্যা বর্তমান জনসমর্থনের পরিমাপ নয়; কিন্তু এগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সামাজিক ও নির্বাচনী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেছে। এই সমর্থন কেবল নিবন্ধিত দলীয় সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের গ্রাম, শহর, শ্রমজীবী সমাজ, কৃষক, শিক্ষক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সমর্থনভিত্তি রয়েছে।

অতএব আওয়ামী লীগের বর্তমান সমর্থনের সঠিক পরিমাণ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব জরিপের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। তবে এটিও সত্য যে সাত দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দল হিসেবে থাকা একটি রাজনৈতিক ধারার সমর্থক ও অনুসারীদের রাতারাতি সামাজিক বাস্তবতা থেকে মুছে দেওয়া যায় না।

গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ

গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—জনগণ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মধ্যে থেকে নিজের প্রতিনিধি বেছে নেবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো দল অপরাধের অভিযোগ থেকে দায়মুক্ত নয়; আবার কোনো রাজনৈতিক মতের অনুসারী হওয়ার কারণেও সাধারণ নাগরিক তার রাজনৈতিক অধিকার হারাতে পারেন না। এই দুই নীতিকে একসঙ্গে ধারণ করাই একটি পরিণত রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ব্যক্তির অপরাধের বিচার হবে ব্যক্তির বিরুদ্ধে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক দল ও তার কোটি কোটি সমর্থকের প্রশ্নটি একইভাবে বিচার করা সবসময় সহজ নয়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে কীভাবে সব রাজনৈতিক মতের শান্তিপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে চায়, তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত ব্যালট, সংসদ, জনসভা, মতপ্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের ভূমিকাও মুছে দেওয়া যায় না

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র জনগণের যুদ্ধ। অসংখ্য রাজনৈতিক মত, শ্রেণি-পেশার মানুষ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, সেনা সদস্য, পুলিশ, ইপিআর সদস্য, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ভূমিকা অস্বীকার করাও ইতিহাসবিরোধী। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই। এখানেই বর্তমান বাংলাদেশের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, দল ক্ষমতা হারাতে পারে, নেতৃত্বের বিচার হতে পারে—কিন্তু রাষ্ট্রের ইতিহাস ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলাতে পারে না। ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০, ৭ মার্চ, ২৫ মার্চ, ২৬ মার্চ, মুজিবনগর সরকার, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৬ ডিসেম্বর—এসব বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের ধারাবাহিক অংশ। এই ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্ব শুধু আওয়ামী লীগেরও নয়; বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবার। কারণ ১৯৭১ বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আত্মসমালোচনার ওপরও

আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অবদান স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে দলটির সাম্প্রতিক শাসনামলের সব কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশের প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগ ফিরবে, ফিরতে হবেই আর এজন্যই ২৪ এর ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার গ্রহণযোগ্য ভূমিকা রাখার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলোর একটি হবে গভীর আত্মসমালোচনা। কেন তরুণদের একটি বড় অংশ দলটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল? কেন নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে এত প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল? কেন ক্ষমতার সুবিধা নেওয়া কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড পুরো দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আওয়ামী লীগের নিজের স্বার্থেই খুঁজতে হবে। ঐতিহাসিক অবদান কোনো দলকে চিরস্থায়ী রাজনৈতিক দায়মুক্তি দেয় না। আবার রাজনৈতিক ব্যর্থতাও কোনো দলের ইতিবাচক ঐতিহাসিক অবদান মুছে দেয় না। পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এই দুই সত্যই একসঙ্গে ধারণ করতে শেখায়।

ফিরে আসার অর্থ আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সব সময়েই প্রসঙ্গিক। কারো কলমের খোচায় সাদা কাগজে নিষিদ্ধ লিখলেই আওয়ামী লীগ বাদ হয়ে যাবেনা। তবুও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছে, তখন “ফিরে আসা” কথাটির অর্থও পরিষ্কার করা জরুরি।এটি যেন কেবল পুনরায় ক্ষমতা অর্জনের অর্থ না হয়। বরং দলটির জন্য প্রকৃত প্রত্যাবর্তন হতে পারে জনগণের মধ্যে ফিরে যাওয়া।কৃষকের কাছে, শ্রমিকের কাছে, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের কাছে, বেকার তরুণের কাছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর কাছে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে।শুধু বক্তব্য দিয়ে নয়—শুনে। শুধু অতীতের অর্জনের তালিকা দিয়ে নয়—বর্তমানের ভুল স্বীকার করে। শুধু বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করে নয়—বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের গণমানুষকেন্দ্রিক শিক্ষা ধারণ করে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান দেশব্যাপী গণসংযোগ করেছিলেন; সেই সময় তিনি তিন মাসের গণসংযোগ কর্মসূচি পরিচালনা করেন এবং বারবার গ্রেপ্তার হন। আজকের আওয়ামী লীগের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—রাজনীতির শক্তি প্রশাসন নয়, জনগণ।

নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন রাজনৈতিক ভাষা দরকার

বর্তমান বাংলাদেশের বড় অংশের ভোটার তরুণ। তাদের কাছে শুধু ঐতিহাসিক আবেগ দিয়ে পৌঁছানো কঠিন। তারা জানতে চায়—চাকরি কোথায়? দুর্নীতি কমবে কীভাবে? মেধার মূল্যায়ন হবে কি? পুলিশ ও প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে কি? ভিন্নমতের মানুষ নিরাপদ থাকবে কি? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহিংসতার বদলে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হবে কি? ক্ষমতায় থাকলে নিজের দলের দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি? ২০২৪ সালের আগস্টের আন্দোলনে রাজনৈতিক কুটকৌশল ও পশ্চীমাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে দেশের তরুনদের একটা বড় অংশকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল।

তরুনেরদের একটা অংশ এই আন্দোলনে শরীক হয়েছিল কারন তাদের বলা হয়েছিল সুশাসন, বৈষম্য রোধ, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও বেকারত্বের অবসান করে কর্মসংস্থান সৃস্টি কিন্তু গত দুই বছরে এসব আশার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। এখনই তরুনেরা বলা শুরু করেছে আগেই ভাল ছিলাম। তরুনদের এই প্রত্যাশাকে মাথায় রেখে ভবিষ্যতের আওয়ামী লীগ যদি এসব প্রশ্নের বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারে, তখনই নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ সম্ভব।

বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রয়োজন, প্রতিহিংসা নয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সমস্যা বারবার ফিরে এসেছে—ক্ষমতাসীন দল বিরোধীদের দুর্বল করার চেষ্টা করেছে, আবার ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রতিপক্ষ প্রতিশোধের রাজনীতিতে গেছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে শুধু দল বদলাবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে না। একটি সুস্থ বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা যেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, নতুন রাজনৈতিক দল কিংবা অন্য যে কোনো বৈধ রাজনৈতিক শক্তি জনগণের সামনে নিজেদের কর্মসূচি তুলে ধরবে এবং জনগণ ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার হতে হবে। অর্থাৎ প্রয়োজন বিচার ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি—দুটিই। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি প্রতিষ্ঠা করলে স্থায়ী রাজনৈতিক শান্তি পাওয়া কঠিন।

শেষ কথা

আওয়ামী লীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তর, সত্তরের নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, মুজিবনগর সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধ—এসব অধ্যায়ে দলটির ভূমিকা প্রামাণ্য ইতিহাসের অংশ। একই সাথে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোকেও উপেক্ষা করা যায় না। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ফলপ্রসূ পথ সম্ভবত ইতিহাস মুছে দেওয়া কিংবা ইতিহাসের দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া—কোনোটিই নয়। প্রয়োজন সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করা। অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে বেরিয়ে আসা। এবং দেশের প্রতিটি নাগরিককে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের তথ্যে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন এখনো স্থগিত। ফলে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শেষ পর্যন্ত আইন, আদালত, রাজনৈতিক সংস্কার এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তের ওপর নির্ভর করবে এটা ভাবাও বোকামি কারন এদেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশের কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী গণতন্ত্র গড়ে তোলা কঠিন। একইভাবে কোনো ঐতিহাসিক দল শুধু তার অতীতের গৌরবের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের গ্রহণযোগ্যতা দাবি করতে পারে না। সুতরাং আওয়ামী লীগের সামনে ভবিষ্যতের পথ যখন উন্মুক্ত হবে, তখন সেই পথের ভিত্তি হওয়া উচিত ইতিহাসের মর্যাদা, আত্মসমালোচনা, জবাবদিহি, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং সর্বোপরি জনগণের আস্থা।

এসএমএফ নবাব সিরাজউদ্দৌলা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।

এই শাখার আরও খবর

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে রান্না করা হল গো-মাংস, ব্যবহার হয় মন্দিরের ইট

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক আয়োজনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক…

মন্দিরের তালা ভেঙে রাধাকৃষ্ণের মূর্তিসহ পূজার সামগ্রী চুরি, আটক ৪

বাংলাদেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের সদর উপজেলায় একটি পারিবারিক মন্দিরের গ্রিলের তালা ভেঙে রাধাকৃষ্ণের মূর্তিসহ বিভিন্ন পূজার সামগ্রী চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে…

চকবাজারে মার্কেটের আগুন ছড়াল পাশের ভবনে, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ১০ ইউনিট

 পুরান ঢাকার চকবাজারে মনজুর খান প্লাজার একটি মার্কেটে লাগা আগুন পাশের আরেকটি ভবনেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করছে। তবে প্রচণ্ড…

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক যোগাযোগে নিরলসভাবে কাজ করছে ART

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যোগাযোগ, সাংগঠনিক তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজে যুক্ত রয়েছে Analysis and Research Team (ART)। সংগঠনটির দাবি,…

হরমুজ নিয়ে মার্কিন জবাব পর্যালোচনা করছে ইরান

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া নিয়ে ইরানের প্রস্তাবের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কী জানিয়েছে, তা পর্যালোচনা করছে তেহরান। পর্যালোচনা শেষ হলে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে নিজেদের অবস্থান জানাবে…

‘জ্ঞানেশের পর মোদি-অমিত শাহের পালা, আমরা থামব না’: রাহুল গান্ধী

ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন বিরোধী দলের নেতারা। একই…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au