মতামত

বার্ধক্য: অভিশাপ না আশীর্বাদ?

মতামত: এ কে সরকার শাওন

  • 11:40 pm - October 12, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১১১ বার
বার্ধক্য নিয়ে মানুষের ভাবনা আজকের নয়। ছবিঃ সংগৃহীত

“বুড়ো হয়ে যাচ্ছি”; কথাটি আমরা সাধারণত আনন্দের সঙ্গে বলি না। চুলে প্রথম ধূসর রং দেখা দিলে মানুষ তা ঢাকতে চায়। মুখে বলিরেখা পড়লে আয়নার সামনে একটু বেশি সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে । হাঁটার গতি কমে এলে মনে পড়ে যৌবনের কথা। অথচ মানুষ পৃথিবীতে আসার পর থেকেই যে জিনিসটির জন্য সবচেয়ে বেশি লড়াই করেছে, সেটি হলো–আরও কিছুদিন বেঁচে থাকা।

তাহলে দীর্ঘ জীবন যদি মানুষের আকাঙ্ক্ষা হয়, বার্ধক্যকে আমরা ভয় পাই কেন? বার্ধক্য কি জীবনের অভিশাপ? নাকি বহু ঝড় পেরিয়ে এত দূর পৌঁছাতে পারাটাই আশীর্বাদ?

প্রশ্নটি এখন আর শুধু ব্যক্তিগত নয়। এটি পৃথিবীর ৮০ কোটিরও বেশি প্রবীণের প্রশ্ন।। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০২০ সালে পৃথিবীতে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০ কোটি। ২০৩০ সালে তা ১৪০ কোটিতে এবং ২০৫০ সালে প্রায় ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। ২০৫০ সালে বিশ্বের অধিকাংশ প্রবীণ মানুষই বাস করবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। অর্থাৎ পৃথিবী শুধু দীর্ঘজীবী হচ্ছে না, পৃথিবী বৃদ্ধও হচ্ছে।

এই জনমিতিক পরিবর্তনের আরেকটি তাৎপর্য আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রতি ছয়জন মানুষের একজনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। ফলে বার্ধক্যকে শুধু পরিবার বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়ে আসছে। কর্মক্ষেত্র থেকে নগর পরিকল্পনা, প্রযুক্তি থেকে অর্থনীতি; আগামী পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকেই প্রবীণ মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে নতুনভাবে মানিয়ে নিতে হবে।

দুই হাজার বছর আগেও ছিল একই প্রশ্ন

বার্ধক্য নিয়ে মানুষের ভাবনা আজকের নয়। প্রাচীন রোমের রাষ্ট্রনায়ক ও দার্শনিক মার্কাস তুলিয়াস সিসেরো খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে বার্ধক্য নিয়ে “দে সেনেক্তুতে” নামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ লিখেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, দুই হাজার বছর আগে তিনিও এমন একটি মানবিক বৈপরীত্যের কথা বলেছিলেন; মানুষ বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বাঁচতে চায়, অথচ সেই বয়সে পৌঁছে বার্ধক্যের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করে।

সিসেরোর কাছে সুন্দর বার্ধক্যের বড় শক্তি ছিল সৎ জীবন, জ্ঞানচর্চা ও সদ্‌গুণ। তাঁর বক্তব্যের মর্মার্থ; যে মানুষ একটি অর্থপূর্ণ জীবন কাটিয়েছেন, শেষ বয়সে সেই জীবনের স্মৃতি ও ভালো কাজ তাঁর সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। কথাটি আজও কত সত্য! যৌবনে আমরা টাকা জমাই, সম্পত্তি করি, বাড়ি বানাই। কিন্তু বার্ধক্যের জন্য আরেক ধরনের সঞ্চয়ও কি প্রয়োজন নয়? বন্ধু, সম্পর্ক, স্মৃতি, সৎ কাজ, জ্ঞান এবং মানুষের ভালোবাসা? এগুলো এমন সম্পদ, যা ব্যাংকের হিসাবে দেখা যায় না; অথচ শেষ বয়সে এর মূল্য কখনো অর্থের চেয়েও বেশি হয়ে উঠতে পারে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে পৃথিবীকে ছোট করবেন না

ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বার্ধক্য নিয়ে অত্যন্ত বাস্তব একটি কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সুন্দর বার্ধক্যের জন্য নিজের আগ্রহের জগৎকে শুধু সন্তান-সন্ততি বা ব্যক্তিগত সমস্যা ঘিরে ছোট করে ফেলা উচিত নয়। এমন কাজ ও আগ্রহ থাকা প্রয়োজন, যা নিজের বাইরের বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে মানুষকে যুক্ত রাখে।

কী অসাধারণ পরামর্শ! বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের চলাচলের পৃথিবী হয়তো কিছুটা ছোট হয়ে আসে। কিন্তু তাই বলে মনের পৃথিবীও কেন ছোট হবে? বই পড়ুন, লিখুন, বাগান করুন, গান শুনুন, নতুন কিছু শিখুন, সমাজের কাজে যুক্ত থাকুন, অন্যকে সাহায্য করুন। যে কাজটি যৌবনে সময়ের অভাবে করতে পারেননি, সম্ভব হলে বার্ধক্যে সেটিই শুরু করুন। শরীরের বয়স বাড়লেই কৌতূহলের বয়স বাড়তেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।

জাপান যেন আগামী পৃথিবীর আয়না

বার্ধক্যের ভবিষ্যৎ দেখতে চাইলে জাপানের দিকে তাকানো যায়। ২০২৪ সালের সরকারি হিসাবে জাপানের ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬২ লাখ। অর্থাৎ দেশটির মোট জনসংখ্যার ২৯.৩ শতাংশ এই বয়সসীমার ওপরে। ভাবুন, প্রায় প্রতি তিনজন মানুষের একজন প্রবীণ। তখন হাসপাতাল কেমন হবে, গণপরিবহন কেমন হবে, ফুটপাত কেমন হবে, বাড়ির নকশা কেমন হবে, কে পরিচর্যা করবে, অবসরকালীন অর্থ কোথা থেকে আসবে; সব হিসাবই বদলে যায়।

আজ জাপান যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে, আগামী কয়েক দশকে পৃথিবীর আরও অনেক দেশকেই সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। বাংলাদেশও তার বাইরে থাকবে না। কারণ বার্ধক্য শুধু একজন মানুষের বয়স বাড়ার ঘটনা নয়; একটি দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের বয়স বাড়লে অর্থনীতি, পরিবার, চিকিৎসা, আবাসন, পরিবহন এবং সামাজিক নিরাপত্তা এগুলোর সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়ে।

বৃদ্ধ মানেই অসুস্থ নয়

আমাদের সমাজের একটি বড় ভুল ধারণা–বৃদ্ধ মানেই অসুস্থ, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল। বাস্তবতা এত সরল নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, বার্ধক্যে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার মধ্যে বিপুল পার্থক্য দেখা যায়। কোনো কোনো ৮০ বছরের মানুষ অনেক কম বয়সী মানুষের মতোই সক্রিয় থাকতে পারেন, আবার কারও অনেক আগেই শারীরিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, বাত, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির সমস্যা, অপুষ্টি, স্মৃতিভ্রংশ, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এবং চলাফেরার অসুবিধা বাড়তে পারে। একসময় যে মানুষটি দশজনের সংসার চালিয়েছেন, তিনিই হয়তো একদিন জামার বোতাম লাগাতে অন্যের সাহায্য চাইবেন। যিনি সন্তানকে হাত ধরে রাস্তা পার করেছেন, একদিন সেই সন্তানই তাঁর হাত ধরে রাস্তা পার করাবে। এটাই জীবনের অদ্ভুত বৃত্ত। সাহায্য নেওয়াটা অপমানের নয়; অপমান শুরু হয় তখন, যখন সাহায্য করার নামে একজন বৃদ্ধ মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদাও কেড়ে নেওয়া হয়।

সুস্থ বার্ধক্যের অর্থ তাই শুধু রোগ না থাকা নয়। একজন মানুষ নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো কতটা করতে পারছেন, নিজের সিদ্ধান্ত কতটা নিতে পারছেন এবং পরিবার ও সমাজের সঙ্গে কতটা যুক্ত থাকতে পারছেন; সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই সক্ষমতাকেই সুস্থ বার্ধক্যের অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা হিসেবে দেখে।

একাকীত্ব;যে রোগ পরীক্ষায় ধরা পড়ে না

বার্ধক্যের সব কষ্ট কোন মেডিকেল পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। একাকীত্বের কোনো রক্ত পরীক্ষা নেই। জীবনসঙ্গী চলে গেছেন, সহকর্মীদের সঙ্গে প্রতিদিনের দেখা নেই, বন্ধুদের কেউ অসুস্থ, কেউ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, সন্তান হয়তো অন্য শহরে কিংবা অন্য দেশে। সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে কথা বলার মতো একজন মানুষও নেই। আবার এর উল্টোটাও হয়। একজন বৃদ্ধ মানুষ সন্তান, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনিতে ভরা বাড়িতেও নিঃসঙ্গ হতে পারেন–যদি তাঁর কথা শোনার সময় কারও না থাকে। তাই একা থাকা আর একাকী হওয়া এক নয়। কখনো মানুষের ভরা বাড়িটিই পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ জায়গা হয়ে উঠতে পারে।

এই নিঃসঙ্গতা শুধু মনের কষ্ট নয়, জনস্বাস্থ্যেরও বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক হিসাবে, প্রায় প্রতি দশজন প্রবীণ মানুষের একজন একাকীত্ব অনুভব করেন এবং প্রায় প্রতি চারজনের একজন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, জীবনমান এবং দীর্ঘায়ুর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বার্ধক্যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর একটি; মানুষ

বয়স বাড়লে আমরা প্রথমে ওষুধ, চিকিৎসক আর হাসপাতালের কথা ভাবি। এসব অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু মানুষেরও প্রয়োজন মানুষ। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন, প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলুন, আত্মীয়ের বাড়ি যান, সামাজিক কাজে অংশ নিন। সম্ভব হলে স্বেচ্ছাসেবী কাজ করুন, ছোটদের কিছু শেখান, নিজের অভিজ্ঞতা অন্যের কাজে লাগান। কারও প্রয়োজন হওয়া মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই বয়স বাড়লেই নিজেকে সংসারের এক কোণে সরিয়ে নেবেন না।

আর পরিবারকেও মনে রাখতে হবে; বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য শুধু খাবার, ওষুধ আর ঘর দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁর কথা শোনার প্রয়োজন আছে, তাঁকে পারিবারিক সিদ্ধান্তে রাখার প্রয়োজন আছে, তাঁকে প্রয়োজনীয় এ কথাটি মনে করানোর প্রয়োজন আছে।

শরীর ও মস্তিষ্ক; কোনোটাকেই পুরোপুরি অবসর নয়

চাকরি থেকে অবসর নেওয়া যায় কিন্তু শরীরকে পুরোপুরি অবসর দিলেই বিপদ। বয়স ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, বাগানের কাজ, ঘরের ছোটখাটো কাজ যা যথা-সম্ভব, তা চালিয়ে যাওয়া ভালো।

সিসেরোও বার্ধক্যের দুর্বলতার বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব সচেষ্ট থাকার কথা বলেছেন। দুই হাজার বছর পর আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও শারীরিক সক্রিয়তার গুরুত্বের কথাই বলছে। তার অর্থ এই নয় যে ৭৫ বছর বয়সে ২৫ বছরের মানুষের মতো শরীরকে ব্যবহার করতে হবে। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে সক্রিয় থাকতে হবে। বয়স হয়েছে বলে বসে যাবেন না; আবার বয়স ভুলে গিয়ে শরীরের ওপর অত্যাচারও করবেন না।

শরীরের মতো মস্তিষ্ককেও কাজে রাখতে হবে। বই পড়ুন, পত্রিকা পড়ুন, লিখুন, হিসাব করুন, দাবা খেলুন, গান শিখুন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার শিখুন, নতুন কোনো বিষয়ে জানুন নাতি-নাতনির কাছ থেকেও শিখুন। এতে লজ্জার কী আছে? একদিন আপনি তাকে চামচ ধরে খেতে শিখিয়েছিলেন, আজ সে আপনাকে মুঠোফোনে ছবি পাঠাতে শেখাচ্ছে। এটাই তো প্রজন্মের সৌন্দর্য।

সন্তানকে ভালোবাসুন, কিন্তু সন্তানের জীবনটিও তাকে দিন

বার্ধক্যের একটি সূক্ষ্ম সমস্যা আছে। চাকরি নেই, কর্মব্যস্ততা কমেছে। তখন অনেক বাবা-মায়ের পুরো মনোযোগ গিয়ে পড়ে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ও নাতি-নাতনির ওপর। কোথায় গেল, কখন ফিরবে, ফোন করল না কেন, আমার কথা শুনল না কেন; এগুলোই ধীরে ধীরে জীবনের প্রধান চিন্তা হয়ে উঠতে পারে। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক, গণিতবিদ, যুক্তিবিদ এবং লেখক বার্ট্রান্ড রাসেল এ জায়গায় একটি কঠিন কিন্তু মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের নিজেদের জীবন যাপন করতে দিতে হবে। ভুলও করতে দিতে হবে। কারণ ভুল করাও জীবনের শিক্ষার অংশ। সন্তানকে ভালোবাসুন, তার জীবনে থাকুন; কিন্তু নিজের জীবনেও রাখুন নিজের বন্ধু, নিজের আগ্রহ, নিজের কাজ, নিজের সকাল, নিজের বিকেল, নিজের আনন্দ। সন্তান যেন আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়, পুরো জীবন নয়।

ভালোবাসার কি বয়স আছে?

ধরা যাক, ৭০ বছর বয়সে একজন মানুষের জীবনসঙ্গী মারা গেলেন। ৭৫ বছর বয়সে তিনি আবার কাউকে পছন্দ করলেন। সমাজ কী বলবে? আমাদের অনেক সমাজে বৃদ্ধ মানুষের ভালোবাসা, সঙ্গীর প্রয়োজন কিংবা পুনর্বিবাহকে এখনও অস্বস্তির চোখে দেখা হয়।

কিন্তু কেন? বৃদ্ধ মানুষ শুধু কারও বাবা, মা, দাদা বা দাদি নন। তিনি নিজেও একজন পূর্ণ মানুষ। তাঁর আবেগ আছে, ব্যক্তিগত জীবন আছে, ভালোবাসার অধিকার আছে, সঙ্গ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। যৌবন চলে গেলেই মানুষের হৃদয় তো অবসরে যায় না। ভালোবাসার কোনো অবসরের বয়স নেই।

বয়সের সঙ্গে মানুষের ভূমিকা বদলায়, কিন্তু মানুষটির ব্যক্তিসত্তা বিলীন হয়ে যায় না। বার্ধক্যে মর্যাদার অর্থ তাই শুধু সম্মানসূচক সম্বোধন নয়; তাঁর পছন্দ, সম্পর্ক, গোপনীয়তা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকেও স্বীকার করা।

অর্থের প্রস্তুতিও জরুরি

সুন্দর বার্ধক্যের আলোচনা শুধু আবেগ দিয়ে শেষ করা যায় না। টাকা লাগে, চিকিৎসা লাগে, ওষুধ লাগে, নিরাপদ বাসস্থান লাগে, কখনো পরিচর্যাকারী লাগে। তাই বার্ধক্যের প্রস্তুতি বার্ধক্যে গিয়ে শুরু করলে অনেক ক্ষেত্রেই দেরি হয়ে যায়। কর্মজীবন থেকেই সঞ্চয়, অবসরকালীন আয়, চিকিৎসার সম্ভাব্য ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ বাসস্থানের কথা ভাবা দরকার। নিজের সম্পত্তি ও অর্থসম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও সুস্থ অবস্থাতেই পরিষ্কার করে রাখা ভালো। কারণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকেও রক্ষা করে।

তবে সব দায় ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। একটি মানুষ সারাজীবন সমাজ ও রাষ্ট্রকে দিয়েছেন; বৃদ্ধ বয়সে সমাজ ও রাষ্ট্রেরও তাঁর প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপদ পরিবহন, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং আইনি সুরক্ষা তাই দয়া নয়; মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।

শহরটিকে একদিন বৃদ্ধ মানুষের চোখ দিয়ে দেখুন

একদিন নিজের শহরটিকে একজন ৮০ বছরের মানুষের চোখ দিয়ে দেখুন। ফুটপাত দিয়ে তিনি হাঁটতে পারবেন? রাস্তা পার হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় পাবেন? বাসে উঠতে পারবেন? সিঁড়ি ভাঙতে পারবেন? হাসপাতালে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কি? ব্যাংকের কাজ নিজে করতে পারবেন? ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার আছে? একটি জরুরি সেবা পেতে তাঁকে কত জায়গায় ঘুরতে হবে?

একজন বৃদ্ধ মানুষের স্বাধীনতা শুধু তাঁর শরীরের ওপর নির্ভর করে না। তাঁর চারপাশের পরিবেশও ঠিক করে দেয় তিনি কতটা স্বাধীন থাকবেন। তাই বৃদ্ধবান্ধব সমাজ মানে শুধু বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ নয়; বরং এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে বৃদ্ধ মানুষ বৃদ্ধাশ্রমের বাইরেও স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন কাটাতে পারেন।

একটি মসৃণ ফুটপাত, বসার একটি বেঞ্চ, সহজে ওঠা যায় এমন একটি বাস, নিরাপদ রাস্তা পারাপার কিংবা ব্যবহারযোগ্য একটি শৌচাগার দেখতে খুব সাধারণ অবকাঠামো মনে হতে পারে। কিন্তু একজন প্রবীণ মানুষের কাছে এগুলোই কখনো ঘর থেকে বের হওয়ার স্বাধীনতা এবং ঘরে বন্দী হয়ে থাকার মধ্যকার পার্থক্য তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বয়সবান্ধব নগর ধারণাতেও তাই পরিবহন, আবাসন, জনপরিসর, সামাজিক অংশগ্রহণ ও সেবাপ্রাপ্তিকে একই সূত্রে দেখা হয়।

বার্ধক্য তাহলে কী; অভিশাপ, না আশীর্বাদ?

প্রাচীন রোমের সিসেরো থেকে আধুনিক ব্রিটেনের বার্ট্রান্ড রাসেল, আজকের জাপান থেকে আগামী দিনের বাংলাদেশ; হাজার বছরের ব্যবধানেও একটি সত্য বদলায়নি। বার্ধক্যে মানুষ কিছু হারায়। শারীরিক শক্তি কমে, প্রিয় মানুষ চলে যায়, কর্মজীবন শেষ হয়, কখনো স্মৃতি দুর্বল হয়, কখনো অন্যের সাহায্য নিতে হয়। কিন্তু বার্ধক্য শুধু হারানোর হিসাবও নয়। এ বয়স অর্জনেরও; অভিজ্ঞতার, স্মৃতির, প্রজ্ঞার, ক্ষমা করার, ছাড়তে শেখার, অন্যকে শেখানোর, আবার নিজে শেখার এবং দীর্ঘ পথ হেঁটে এসে জীবনটাকে একটু দূর থেকে দেখার।

তাহলে বার্ধক্য অভিশাপ, না আশীর্বাদ? সম্ভবত বার্ধক্য নিজে কোনোটিই নয়। নিঃসঙ্গতা, দারিদ্র্য, অসুস্থতা, অবহেলা, নির্যাতন, পরনির্ভরতা ও অসম্মান তাকে অভিশাপে পরিণত করতে পারে। আবার স্বাস্থ্য যতটা সম্ভব ধরে রেখে, সম্পর্ক বাঁচিয়ে, কৌতূহল জাগিয়ে, আর্থিক প্রস্তুতি নিয়ে, ভালোবাসা পেয়ে, নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার ধরে রেখে এবং সমাজের কাছে মর্যাদা নিয়ে বৃদ্ধ হতে পারলে বার্ধক্য জীবনের পরাজয় নয়; বরং এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারার গৌরবোজ্জ্বল সাক্ষ্য।

আজকের তরুণই আগামী দিনের বৃদ্ধ। তাই বৃদ্ধ মানুষের জন্য নিরাপদ সমাজ তৈরি করা অন্য কারও জন্য দয়া নয়; নিজের ভবিষ্যতের জন্যই বিনিয়োগ। একদিন আমাদের হাতও কাঁপতে পারে, হাঁটার গতি কমতে পারে, স্মৃতি ভুল করতে পারে, সন্তান দূরে থাকতে পারে, প্রিয় মানুষটি আগে চলে যেতে পারেন। সেদিন পৃথিবীর কাছে আমাদের চাওয়া হয়তো খুব বেশি হবে না। শরীর দুর্বল হলেও যেন অধিকার দুর্বল না হয়, স্মৃতি দুর্বল হলেও যেন পরিচয় হারিয়ে না যায়, আয় কমলেও যেন সম্মান কমে না যায়, বয়স বাড়লেও যেন ভালোবাসার অধিকার শেষ না হয়।

আর জীবনের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে যেন একজন মানুষ বলতে পারেন;

“আমার বয়স বেড়েছে, কিন্তু আমার জীবন এখনো আমারই।”

এ কে সরকার শাওন

কবি, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক

তথ্যসূত্র

১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: বার্ধক্য ও স্বাস্থ্য।

২. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: সুস্থ বার্ধক্য ও প্রবীণ মানুষের পরিচর্যা।

৩. জাপান পরিসংখ্যান ব্যুরো, জনসংখ্যা হিসাব, ২০২৪।

৪. মার্কাস তুলিয়াস সিসেরো; বার্ধক্য বিষয়ে।

৫. বার্ট্রান্ড রাসেল; কীভাবে বৃদ্ধ হতে হয়, ১৯৫৬।

৬. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব।

৭. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: বয়সবান্ধব শহর ও জনগোষ্ঠী।

এই শাখার আরও খবর

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে রান্না করা হল গো-মাংস, ব্যবহার হয় মন্দিরের ইট

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক আয়োজনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক…

মন্দিরের তালা ভেঙে রাধাকৃষ্ণের মূর্তিসহ পূজার সামগ্রী চুরি, আটক ৪

বাংলাদেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের সদর উপজেলায় একটি পারিবারিক মন্দিরের গ্রিলের তালা ভেঙে রাধাকৃষ্ণের মূর্তিসহ বিভিন্ন পূজার সামগ্রী চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে…

চকবাজারে মার্কেটের আগুন ছড়াল পাশের ভবনে, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ১০ ইউনিট

 পুরান ঢাকার চকবাজারে মনজুর খান প্লাজার একটি মার্কেটে লাগা আগুন পাশের আরেকটি ভবনেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করছে। তবে প্রচণ্ড…

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক যোগাযোগে নিরলসভাবে কাজ করছে ART

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যোগাযোগ, সাংগঠনিক তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজে যুক্ত রয়েছে Analysis and Research Team (ART)। সংগঠনটির দাবি,…

হরমুজ নিয়ে মার্কিন জবাব পর্যালোচনা করছে ইরান

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া নিয়ে ইরানের প্রস্তাবের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কী জানিয়েছে, তা পর্যালোচনা করছে তেহরান। পর্যালোচনা শেষ হলে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে নিজেদের অবস্থান জানাবে…

‘জ্ঞানেশের পর মোদি-অমিত শাহের পালা, আমরা থামব না’: রাহুল গান্ধী

ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন বিরোধী দলের নেতারা। একই…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au