রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, দুই দেশ এ বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পর রাশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই এখনো জানেন না তিনি। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে কিয়েভ।
রোববার (১১ অক্টোবর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতি অবিলম্বে কার্যকর হচ্ছে।
পোস্টে তিনি লেখেন, ‘রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধে জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে। উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়েছে। চুক্তিটি ভঙ্গ করবেন না!’
তবে এই যুদ্ধবিরতির শর্ত কী, কত দিন তা কার্যকর থাকবে এবং দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি ট্রাম্প।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে বিস্তারিত জানেন না জেলেনস্কি
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি জানান, ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাবের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানতে পারেননি তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি এখনো বিস্তারিত কিছু জানতে পারিনি। ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির পক্ষে এবং রাশিয়ারও তা সমর্থন করা জরুরি। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’
ট্রাম্পের ঘোষণায় বিস্ময় প্রকাশ করলেও যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ইউক্রেনের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন জেলেনস্কি। তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে ইউক্রেন সমর্থন জানায়, তবে রাশিয়াকেও একই অবস্থান নিতে হবে।
এদিকে, ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে মস্কোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের নির্দেশ ট্রাম্পের
জ্বালানি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইউক্রেনে নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের কথাও বলেছেন তিনি।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর একাধিক সুযোগ হাতছাড়া করেছেন জেলেনস্কি।
এর আগে শনিবারও জেলেনস্কিকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউক্রেনের অবশ্যই রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ করা উচিত। ইউক্রেনীয়দের নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বানও জানান তিনি।
ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে বিদ্যমান টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
রাশিয়ার জ্বালানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে রাশিয়ার ডিজেলের ওপর থেকে ছয় মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত ৯ অক্টোবর হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ট্রাম্পের ইরানকেন্দ্রিক নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েও ইউক্রেন যুদ্ধের জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সে সময় রাশিয়া বা ইউক্রেন, কোনো পক্ষই এমন চুক্তির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেনি।
যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে ইউক্রেনের ওপর চাপ যুক্তরাষ্ট্রের
রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করেছিল বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউসের একটি সূত্র।
সূত্রটির দাবি, কিয়েভকে হামলা বন্ধে রাজি করাতে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ এবং ‘প্রাইওরিটাইজড ইউক্রেন রিকোয়ারমেন্টস লিস্ট’ (পার্ল) কর্মসূচির আওতায় অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করার হুমকি দিয়েছিল।
ইউক্রেনের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক অস্ত্র সরবরাহের এ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশটির প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুমকির বিষয়ে এর আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
সূত্রটি আরও জানায়, ট্রাম্পের সঙ্গে সৃষ্ট টানাপোড়েন কমাতে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন জেলেনস্কি। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি জেলেনস্কির
ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী, জেলেনস্কির পাঁচ বছরের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে সামরিক আইন জারি থাকায় দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। জেলেনস্কি এখনো প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন।
রোববার ট্রাম্প ইউক্রেনীয়দের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান। এর কয়েক ঘণ্টা পর টেলিগ্রামে প্রকাশ করা এক ভিডিওবার্তায় জেলেনস্কি বলেন, দেশের নেতা নির্বাচনের অধিকার ইউক্রেনের জনগণের। তবে নির্বাচন আয়োজনের আগে যুদ্ধের অবসান হওয়া প্রয়োজন।
ইউক্রেনের আইনে সামরিক আইন চলাকালে নির্বাচন আয়োজন নিষিদ্ধ। এ কারণে নির্বাচন করতে হলে আগে যুদ্ধবিরতি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছে কিয়েভ।
জেলেনস্কি জানান, তিনি নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুত। তবে সে জন্য রাশিয়াকে ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে হবে।
ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘দয়া করে পুতিনকে বলুন, আমাদের দুই মাস বা ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি দিন। ৬০ দিন সময় পেলে আমরা নির্বাচনের আয়োজন করব।’
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা, রাশিয়ার নীরবতা এবং জেলেনস্কির নির্বাচনের শর্ত, সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের বিষয়ে বাস্তব কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পর।
সূত্র : রয়টার্স