নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের কর্মকাণ্ডকে ‘কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’ বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবিকৃত ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর আদায়সংক্রান্ত মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন আদালত। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী দ্রুত বকেয়া কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের বিচারকদের স্বাক্ষরের পর রায় দুটি প্রকাশিত হয়। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা দুটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দিয়েছিলেন আদালত।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ন্যায্য রাজস্ব পাওয়া থেকে বঞ্চিত করতে গ্রামীণ কল্যাণ কোনো চেষ্টার ঘাটতি রাখেনি বলে আদালতের পর্যবেক্ষণ। আদালতের মতে, নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া একটি বিষয় দীর্ঘায়িত করে কর পরিশোধ এড়ানোর চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখার মাধ্যমে সরকারকে প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
মামলাটি ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের আয়কর দাবি নিয়ে। এই সময়ের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর দাবি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ওই দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন করে।
আদালত রায়ে আরও উল্লেখ করেন, একই প্রতিষ্ঠান ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ করবর্ষের জন্য একই ধরনের আয়কর পরিশোধ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ওই করের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৯ সালে ৩৬৩ নম্বর ইনকাম ট্যাক্স রেফারেন্স দায়ের করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। আদালতের মতে, এ অবস্থানের সঙ্গে আগের অবস্থানের অসংগতি রয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, আবেদনকারী নিজের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে একই বিষয় নিয়ে বারবার বক্তব্য দিচ্ছে। পাশাপাশি আদালতের আদেশের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের প্রবণতার কথাও উল্লেখ করা হয়।
রায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আইন অনুযায়ী এবং যথাসম্ভব দ্রুত গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রিট আবেদন খারিজ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ওই অর্থ আদায়ের পথ উন্মুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, পূর্ণাঙ্গ রায় বিস্তারিত পর্যালোচনা করার পর তাঁরা আপিল করবেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দাবিকৃত ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের বিষয়ে দেওয়া একটি রায় স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করেছিলেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের বেঞ্চ ওই সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
পরবর্তী সময়ে মামলাটি নতুন বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হয়। পুনর্মূল্যায়নের পর গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা দুটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে নতুন বেঞ্চ রুল খারিজ করে রায় দেন। ফলে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য দাবিকৃত ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে।