মন্দিরের পাশে গরুর মাংস রান্নার প্রতিবাদ করায় জাবির হিন্দু শিক্ষার্থী বহিষ্কার। ছবিঃ সংগৃহীত
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না নিয়ে প্রতিবাদের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক; পরে মহানবীকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈকত হালদার সাময়িক বহিষ্কার, তদন্ত কমিটি গঠন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক আয়োজন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীর নাম সৈকত হালদার। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি অফিস আদেশে সাময়িক বহিষ্কার ও তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য জানানো হয়।
তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্নার আয়োজন এবং এর প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। একই ঘটনায় এক পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগের তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যবহার হয় মন্দিরের ইট। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
কী বলা হয়েছে বহিষ্কারের আদেশে?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আদেশে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শিক্ষার্থী সৈকত হালদারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ-২০১৮-এর ৪(১)(খ) ধারা অনুযায়ী সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।
অন্য আদেশে অভিযোগ তদন্তের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি করা হয়েছে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা নাজমুল মানছুরকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ-জেইউ) অধ্যাপক কে এম জাহিদুল ইসলাম এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের ওয়ার্ডেন মো. আলমগীর কবির। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (সাধারণ প্রশাসন) মো. মাহতাব-উজ-জাহিদকে কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে।
অফিস আদেশে আরও বলা হয়েছে, অভিযোগটি দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ২৯৫(ক) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগও তদন্ত করা হবে।
তবে সাময়িক বহিষ্কারকে চূড়ান্ত অপরাধ প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের যথার্থতা যাচাই করার কথা।
জবির কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না নিয়ে বিতর্ক
এর আগে সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে পিকনিক আয়োজনের অভিযোগ ওঠে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ১৭তম ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে রান্নার আয়োজন করা হয়। এ নিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের হস্তক্ষেপে রান্না শেষ করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা অন্যত্র গিয়ে খাবার গ্রহণ করেন বলে জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে আয়োজনটির উদ্দেশ্য, স্থান নির্বাচন এবং মন্দিরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কয়েকটি পোস্টে অভিযোগ করা হয়, রান্নার চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলের নির্ভরযোগ্য ছবি-ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত প্রয়োজন।
সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের একাংশের উদ্বেগ, দীর্ঘদিনের দাবির পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মন্দিরের জন্য জায়গা পাওয়ার পরও উপাসনাস্থলটির মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রতিবাদের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা ঘটেছে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ফেসবুক পেজ ‘জবিয়ান্স’-এ মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্নার আয়োজন নিয়ে একটি পোস্ট প্রকাশের পর মন্তব্যের ঘরে ধর্মীয় অনুভূতি ও উপাসনালয় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যায়।
ওই বিতর্কের একপর্যায়ে সৈকত হালদারের বিরুদ্ধে মহানবীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। পরে কথিত মন্তব্যের স্ক্রিনশট বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরে তাঁকে সাময়িক বহিষ্কার করে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটের সত্যতা, সম্পূর্ণ কথোপকথনের প্রেক্ষাপট এবং বক্তব্যটি আদৌ সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর কি না, তা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের উপাসনাস্থল, ধর্মীয় অনুভূতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালিত হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি বহুধর্মীয় ও বহুমতের শিক্ষাঙ্গন। সেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কোনো শিক্ষার্থী বা গোষ্ঠী অন্যের ধর্মীয় পরিচয়কে অবজ্ঞা করে এমন আচরণ করলে অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে যথাযথ তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।