দেশের খুচরা বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম লাগামছাড়া হয়ে উঠেছে। কোথাও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার। আবার কোথাও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এলপিজির দাম বাড়ার পেছনে চারটি প্রধান কারণ রয়েছে। এগুলো হলো আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, আমদানিতে অর্থায়নের সংকট এবং দেশে সরবরাহ ঘাটতি।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জাহাজ চলাচল ও পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহের খরচ বেড়েছে।
অন্যদিকে, দেশের পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক গ্রাহক রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এতে বাজারে চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে সরবরাহ না বাড়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এলপিজি সরবরাহকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ বা ব্যাহত হওয়ায় বাজারে চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণ ও আমদানি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কিছু প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত আমদানি কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এদিকে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও খুচরা বাজারে তা সব ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। কোনো কোনো বিক্রেতার বিরুদ্ধে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এতে পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০০ টাকার বেশি হচ্ছে।
ওমেরা এলপিজির চিফ অপারেটিং অফিসার মাথেন্দ্র ডি জয়োশা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং দেশের বাজারে সরবরাহের ওপর চাপের মধ্যেও নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম চালু রেখেছে ওমেরা পেট্রোলিয়াম।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা ও আমদানিতে অর্থায়নের জটিলতার কারণে দেশের বেশ কয়েকটি বড় এলপিজি অপারেটর স্বাভাবিক আমদানি কার্যক্রম বজায় রাখতে পারছে না। এতে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে এবং চাহিদার তুলনায় এলপিজির প্রাপ্যতায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
মাথেন্দ্র ডি জয়োশার ভাষ্য, ওমেরার আর্থিক সক্ষমতা ও পরিচালনগত প্রস্তুতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত আমদানি চালিয়ে যেতে পারছে। তবে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে তাদের সরবরাহ সক্ষমতার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, গত অক্টোবর মাসে বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে কোথাও কোথাও এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যবিধি অনুসরণে ওমেরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
মাথেন্দ্র ডি জয়োশা আরো বলেন, বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আমদানিকারক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পরিবেশকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমদানি অর্থায়নের বাধা দূর করা এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
এদিকে এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইগ্যাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের আমদানি ও বিক্রির তথ্য যাচাই করা সম্ভব। দৈনন্দিন বিক্রির রেকর্ডও সংরক্ষণ করা হয়। তাই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু কোম্পানিগুলোকে দায়ী করা ঠিক নয় বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।
আইগ্যাসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জাহাজ চলাচলে পরিবর্তন আসায় এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি আমদানিতে বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে।
বাজার পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, জানতে চাইলে আইগ্যাসের পক্ষ থেকে বলা হয়, তা নির্ভর করছে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং জাহাজগুলোকে আগের কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। ফলে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।