বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করেছেন তিনি। ছবি: উইকিপিডিয়া
ওটিএন বাংলা ডেস্ক: ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘অপরিণত’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, এতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ হারিয়েছে দেশ।
শেখ হাসিনা বলেন, ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া কিংবা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাবের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করলে তা উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দায়িত্বশীল সরকারের কাজ দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।
পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। তবে গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে তিনি অংশ নেননি।
শেখ হাসিনার মতে, ব্রিকস কেবল একটি কূটনৈতিক সমাবেশ নয়; এটি বড় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশ অংশ নিলে অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নতুন সহযোগিতার পথ খুঁজে পেতে পারত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নয়াদিল্লিতে তাঁর অবস্থান যদি তারেক রহমানের সম্মেলনে না যাওয়ার কারণ হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বা ব্যক্তিগত বিবেচনা দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নির্ধারণ করা উচিত নয়।
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা অতীতের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, তিনি দিল্লিতে অবস্থান করার সময়ও জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ভারত সফর করেছিলেন। আবার ১৯৮০ সালে তিনি লন্ডনে থাকাকালীন জিয়াউর রহমান সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রশ্ন, তখন তাঁর উপস্থিতি সফরের প্রতিবন্ধক না হলে এখন কেন তা হবে?
নিজের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর মেয়াদে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীন, রাশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। একটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য অন্য দেশের সঙ্গে বৈরিতা প্রয়োজন হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর হওয়া উচিত বলেও জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনার ভাষ্য, ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বন্ধু। অন্যদিকে চীন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আসিয়ান ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সমস্যা তৈরি হয় যখন একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য ভারতবিরোধী বক্তব্য উৎসাহিত করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দেয়। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। ভারত জানিয়েছিল, ওই আয়োজনের সঙ্গে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং শেখ হাসিনার মন্তব্যকেও তারা সমর্থন করেনি।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও একাধিক অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে, বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের একটি বড় রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বহু মানুষ কারাবন্দি হয়েছেন, আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন কিংবা ঘরবাড়ি, চাকরি ও জীবিকা হারিয়েছেন।
দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানালেও কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তাঁর প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নেওয়া। বাংলাদেশের জনগণকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের আদালতে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা স্বীকার করেন, দেশে ফেরা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে তিনি ভয় পান না বলে জানান। ১৯৭৫ সালে পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড, ১৯৮১ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
মৃত্যুদণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর উদ্বেগ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও।
পিটিআইয়ের দেওয়া এই সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: পিটিআই প্রতিবেদন।