শারদীয় দুর্গোৎসব এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা গভীর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা, সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি এবং নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-এ দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা। নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, বিচারহীনতার অভিযোগ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের কথা উল্লেখ করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
নিবন্ধের শুরুতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব সনাতন ধর্মাবলম্বীকে দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানান শেখ হাসিনা। তিনি লেখেন, দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন। অশুভ শক্তির বিনাশ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয় এবং কল্যাণ ও সুন্দরের আরাধনাই এই উৎসবের মূল শিক্ষা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে তৈরি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ছবি: সংগৃহীত
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
শেখ হাসিনা তাঁর নিবন্ধে অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ধরনের হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। তাঁর দাবি, এসব ঘটনা দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করবেন।
শেখ হাসিনা লেখেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর পরিচিত বক্তব্য, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ সবার দেশ।
৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ
নিবন্ধে শেখ হাসিনা দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে দেশে ভয়ের সংস্কৃতির সূচনা হয়। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়গুলো ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগির খামার, মাছের খামার ও ফলের বাগানেও হামলা চালানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে হত্যা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানি অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শেখ হাসিনার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নির্বিচার ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার হামলাকারী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির জন্য দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধীদের বিচারের আওতায় না আনা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলে আইনের শাসন দুর্বল হয়েছে।
নিবন্ধে তিনি আরও দাবি করেন, পরবর্তী সময়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও রাজনৈতিক নিপীড়ন, দায়মুক্তি ও ভয়ের সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিবন্ধে সংশ্লিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি।
গণপতি চক্রবর্তী, দীপু চন্দ্র দাস ও চিন্ময় প্রভুর প্রসঙ্গ
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে গিয়ে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন শেখ হাসিনা।
তিনি রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার কথা তুলে ধরে অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। তাঁর দাবি, দ্রুত ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

রংপুরে একসঙ্গে হত্যার শিকার হয়েছেন এক পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতিছবি: সংগৃহীত
এ ছাড়া ভালুকার দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, ওই ঘটনায় অভিযুক্ত ও আত্মস্বীকৃত আসামিরা জামিন পেয়েছেন। একই নিবন্ধে চিন্ময় প্রভুর কারাবাস এবং তাঁর অসুস্থ মাকে শেষবারের মতো দেখতে না পারার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
শেখ হাসিনা লেখেন, মাকে শেষবার দেখার আকুতি নিয়েই চিন্ময় প্রভুর মা মারা যান। পরে মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। মায়ের শেষকৃত্যে চিন্ময় প্রভুর কান্নাভেজা মুখকে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অসহায়ত্ব ও বেদনার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
এসব ঘটনার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা প্রশ্ন তোলেন, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মুক্তি পেলেও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলার কারণে একজন ধর্মীয় নেতা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকবেন কেন।
তাঁর মতে, বিচারহীনতা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উৎসাহিত করে, নির্যাতনকারীদের সাহস জোগায় এবং ভুক্তভোগীদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল করে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে হবে, এমন পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংখ্যালঘু কমিশন ও সুরক্ষা আইনের অঙ্গীকার
নিবন্ধে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমান মর্যাদায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানান, আওয়ামী লীগের ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় ও মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার ছিল।
শেখ হাসিনা লেখেন, এসব অঙ্গীকার এখনো অটুট রয়েছে। তাঁর মতে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে তাঁদের অধিকার রক্ষা, অপরাধের বিচার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা জরুরি।
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান
দুর্গোৎসব উপলক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী নাগরিকদের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার পাশাপাশি কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দেওয়ার পরামর্শ দেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে তিনি লেখেন, তাঁরা একা নন এবং বাংলাদেশ তাঁদেরও দেশ।
শেখ হাসিনার ভাষ্য, বাংলাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে একে অন্যের ধর্মীয় উৎসবে পাশে দাঁড়িয়েছে। কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তি এই দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
‘মন্দির পাহারা দিয়ে পূজা করতে হবে না’
নিবন্ধের শেষাংশে শেখ হাসিনা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বঞ্চিত হতে হবে না, মন্দির পাহারা দিয়ে পূজা করতে হবে না এবং কোনো মাকে তাঁর সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিককে সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেওয়া। মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে শান্তি, সম্প্রীতি, মানবিক মর্যাদা ও সমঅধিকারের বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
নিবন্ধের শেষে দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ বাংলাদেশের সব নাগরিকের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন শেখ হাসিনা। ‘শুভ শারদীয়া’, ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ লিখে তিনি বাংলাদেশের চিরজীবন কামনা করেন।
সূত্র: ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-এ শেখ হাসিনার দুর্গোৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত নিবন্ধ।