পূজার আগ মুহূর্তে দিয়াশলাইয়ের কাঠির প্রতিমা অপসারণের নির্দেশ। ছবিঃ সংগৃহীত
শারদীয় দুর্গাপূজার আর মাত্র এক দিন বাকি। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, চারদিকে উৎসবের আমেজ। এমন সময়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুরে দেড় লাখ দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে তৈরি ব্যতিক্রমী দুর্গাপ্রতিমা অপসারণের নির্দেশ ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পূজার ঠিক আগমুহূর্তে এমন নির্দেশনায় হতাশ হয়ে পড়েছেন আয়োজক কমিটির সদস্য ও প্রতিমাশিল্পীরা। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তৈরি প্রতিমাটি রেখেই পূজা সম্পন্ন করতে চান তাঁরা। এ জন্য প্রশাসনের অনুমতি পেতে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করছেন কমিটির সদস্যরা।
এ বছর ব্রহ্মরাজপুরের এই দুর্গাপ্রতিমা সাতক্ষীরা জেলার অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। দেড় লাখ দিয়াশলাইয়ের কাঠি ব্যবহার করে প্রতিমা তৈরির অভিনব উদ্যোগটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। ব্যতিক্রমী এই শিল্পকর্ম দেখতে দর্শনার্থীদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রতিমাটি নির্মাণে আয়োজক কমিটি ও শিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু পূজার একেবারে শেষ সময়ে এটি অপসারণের নির্দেশ আসায় তাঁদের পুরো আয়োজন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
আয়োজক কমিটির সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ প্রতিমাটি পরিদর্শনে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিমাটি অপসারণের নির্দেশ দেন বলে দাবি করেছেন আয়োজকেরা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক নির্দেশটিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিটি প্রতিমাটি অপসারণ না করলে প্রশাসন নিজ উদ্যোগে তা সরিয়ে দেবে বলেও জানানো হয়।
এ নির্দেশের পর থেকেই প্রতিমাটি রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পূজার প্রস্তুতি সামলানোর পাশাপাশি প্রতিমাটি রাখার অনুমতি পেতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করছেন কমিটির সদস্যরা। তাঁদের আশা, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান প্রতিমাটি রেখেই পূজা সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে।
আয়োজক কমিটি ও প্রতিমাশিল্পীদের দাবি, প্রতিমাটি তৈরির সময় থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রতিমাটি পরিদর্শন করেছেন। দিয়াশলাইয়ের কাঠি থেকে বারুদ অপসারণের পর প্রতিমাটিকে নিরাপদ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের।
এ ছাড়া প্রতিমার পাশে বালু ও পানি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তার দায়দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে তাঁরা লিখিত অঙ্গীকারনামাও দিয়েছেন বলে দাবি কমিটির সদস্যদের। তাঁদের বক্তব্য, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেসব পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব ব্যবস্থা গ্রহণের পরও প্রতিমা অপসারণের নির্দেশ আসায় হতাশ আয়োজকেরা। তাঁদের মতে, পূজার আর মাত্র এক দিন বাকি থাকতে প্রতিমাটি সরিয়ে নতুন করে আরেকটি প্রতিমা তৈরি করা বাস্তবসম্মত নয়। এতে শুধু দীর্ঘদিনের শ্রম ও ব্যয়ই নষ্ট হবে না, পূজার আয়োজনও ব্যাহত হবে।
কমিটির সদস্যরা জানান, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে তাঁদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিমা অপসারণের নির্দেশ তাঁদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। তাঁরা বর্তমান প্রতিমাটি রেখেই পূজা সম্পন্ন করতে চান এবং সে জন্য প্রশাসনের কাছে অনুমতি চাইছেন।
আয়োজকদের দাবি, প্রতিমাটি নিয়ে নিরাপত্তার উদ্বেগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁরা প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ পরিবেশে পূজা সম্পন্ন করতে আগ্রহী। তবে প্রতিমাটি অপসারণের সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় প্রতিমাটি নিয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন আয়োজক কমিটির সদস্য ও শিল্পীরা। একদিকে ব্যতিক্রমী এই প্রতিমাকে ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহ, অন্যদিকে প্রশাসনের অপসারণের নির্দেশ, সব মিলিয়ে ব্রহ্মরাজপুরের পূজামণ্ডপে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। শেষ পর্যন্ত প্রতিমাটি রেখেই পূজা করার অনুমতি মিলবে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন আয়োজকেরা।